নিজস্ব সংবাদদাতা, বগুড়া
বগুড়ার শিবগঞ্জে ভোরবেলা ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন এক ট্রাকচালক। তার নাম মিনহাজ (২৮)। তিনি টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর উপজেলার পাতারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আলম শেখের ছেলে। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন ট্রাকের সহকারী ইমরান হোসেন (৩০)। আহত ইমরান একই গ্রামের শাহ আলমের ছেলে।
শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) ২০২৫ ইং ভোর সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার পাকুড়তলার ভরিয়া এলাকায় এসএস ফুডজোন হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টের সামনে বগুড়া-রংপুর মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের ওই স্থানে একটি ঢাকাগামী ট্রাক চাকা নষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এরই মধ্যে রংপুর থেকে ছেড়ে আসা একটি পাথরবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়।
ধাক্কার ফলে পাথরবোঝাই ট্রাকটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং চালক মিনহাজ ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় তার সহকারী ইমরানকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
পুলিশের বক্তব্য
ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করা কুন্দারহাট হাইওয়ে থানার এটিএসআই উলাল উদ্দিন জানান, দুর্ঘটনার প্রাথমিক কারণ হিসেবে চালকের ঘুমভাবকেই দায়ী করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “পাথরবোঝাই ট্রাকের চালক ঘুমন্ত অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দেন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।”
এটিএসআই আরও জানান, নিহত চালকের মরদেহ উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি আহত সহকারীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কুন্দারহাট হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় জড়িত উভয় ট্রাক পুলিশ জব্দ করেছে এবং এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালবেলা মহাসড়কটিতে যানবাহনের চাপ তুলনামূলক কম ছিল। তবে দুর্ঘটনার সময় পাথরবাহী ট্রাকটি দ্রুতগতিতে আসছিল। দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে আঘাতের শব্দ এতটাই জোরালো ছিল যে আশপাশের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। স্থানীয়রা আহত সহকারীকে উদ্ধার করলেও চালককে জীবিত পাওয়া যায়নি।
সড়ক দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া
মাত্র ২৮ বছর বয়সে এভাবে প্রাণ হারানোয় নিহত চালকের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। জানা গেছে, মিনহাজ কয়েক বছর ধরেই পেশাদার ট্রাকচালক হিসেবে কাজ করছিলেন। পরিবার চালানোর দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। গ্রামের মানুষজনও এ মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছেন না।
আহত সহকারী ইমরানের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তিনি এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা ইস্যু
বাংলাদেশে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানো, সড়কের বিভিন্ন স্থানে নিয়ম না মেনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি এবং গতির নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।
বগুড়া-রংপুর মহাসড়কটি দেশের একটি ব্যস্ততম রুট। প্রতিদিন হাজারো যানবাহন চলাচল করে এই সড়ক দিয়ে। কিন্তু বিশ্রামহীন চালকদের কারণে প্রায়ই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
দুর্ঘটনা এড়াতে করণীয়
যানবাহন বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক বা বাসকে অবশ্যই সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বা লাইট ব্যবহার করতে হবে, যাতে অন্য চালকরা আগেই সাবধান হতে পারেন। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর পর চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বলছে, সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কঠোর আইন প্রয়োগই দুর্ঘটনা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
শেষকথা
শিবগঞ্জের এ দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিলো দেশের সড়ক পরিবহন খাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়টি। এক তরুণ চালকের প্রাণহানি ও এক সহকারীর গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে চরম দুঃখ ও হতাশা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিলে হয়তো ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কমে আসবে।