নিজস্ব সংবাদদাতা, রংপুর: ১০ অক্টোবর, ২০২৫
রংপুর শহরের জনপ্রিয় হাসপাতালগুলোর মধ্যে অন্যতম “পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার”। প্রতিদিন শত শত মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এই হাসপাতালে চিকিৎসার আশায় আসেন। কেউ বুকের ব্যথা নিয়ে, কেউ ডায়াবেটিস বা কিডনি সমস্যার কারণে, কেউ আবার এক টুকরো আশার আলো খুঁজতে ছুটে আসেন প্রিয়জনকে নিয়ে।
কিন্তু হাসপাতালের চেয়ারে বসে থাকা সেই রোগীদের মুখে একটাই অভিব্যক্তি—অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর অসহায়ত্ব।
বসার জায়গায় কেউ বয়স্ক বাবা, হাতে প্রেসক্রিপশন চেপে বসে আছেন ক্লান্ত চোখে। পাশে এক মা শিশুকে কোলে নিয়ে নিঃশব্দে তাকিয়ে আছেন দেয়ালের ঘড়ির দিকে। মিনিটের কাঁটা এগোচ্ছে, কিন্তু ডাক পড়ছে না। কেউ ফোনে বাড়ির কাউকে বলছেন—“আর একটু, এখনই ডাকবে।” কিন্তু সেই “আর একটু” কখন যে ঘন্টার পর ঘন্টায় গড়িয়ে যায়, তা তারা নিজেরাই জানেন।
সময় যেন এখানে থেমে যায়
রোগীরা যেভাবে অপেক্ষা করেন, তা শুধু চিকিৎসা পাওয়ার জন্য নয়—এটা একরকম মানসিক যন্ত্রণার সময়ও।
বেশিরভাগ রোগী সকালে আসেন, কিন্তু দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও ডাক পড়ে না।
চিকিৎসকদের ব্যস্ততা বোঝা যায়, কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষ যখন দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে, না বসে, উদ্বেগে ঘামতে থাকে—তখন বিষয়টি কেবল দেরি নয়, মানবিকতারও প্রশ্ন তোলে।
ক্লান্ত মুখের পেছনের নিঃশব্দ যন্ত্রণা
একজন বৃদ্ধা, যিনি লাঠিতে ভর করে এসেছেন, কাঁপা গলায় বললেন—“ছেলে চাকরিতে আছে, আমি একা এসেছি। সকাল আটটা থেকে বসে আছি। এখন দুপুর দুইটা, এখনও ডাকেনি।”
আরেকজন শ্রমজীবী মানুষ বললেন—“দুই দিন ধরে কাজ বন্ধ রেখেছি। শুধু ডাক্তার দেখানোর জন্য এসেছি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, এই অপেক্ষা আরও লম্বা হবে।”
এইসব কণ্ঠগুলো কোনো অভিযোগ নয়, বরং সমাজের এক নিঃশব্দ চিত্র—যেখানে অসুস্থ মানুষও নিজের সময়ের মূল্য হারিয়ে ফেলেছে।
চিকিৎসা শুধু প্রেসক্রিপশন নয়, সহানুভূতিও
রোগীর প্রতি সহানুভূতি মানে শুধু “ভালো ব্যবহার” নয়, বরং সময়ের মূল্য বোঝা।
একজন ডাক্তার যত ব্যস্তই থাকুন, তবুও রোগীর চোখে যে ভরসার দৃষ্টি—তা যেন হারিয়ে না যায়।
যদি প্রশাসন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সামান্য মনোযোগ দেয়, তাহলে এই দৃশ্যপট অনেকটাই বদলানো সম্ভব।
প্রতিটি হাসপাতালে উচিত রোগীদের জন্য অপেক্ষার স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ তৈরি করা, যেমন—
পর্যাপ্ত বসার জায়গা,
বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা,
নিয়মিত তথ্য জানাতে স্টাফদের সক্রিয় ভূমিকা,
এবং সবচেয়ে জরুরি—নির্ধারিত সময়ে ডাকের ব্যবস্থা।
মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে পরিবর্তন আনতে
রোগীরা শুধু অসুস্থ নন, তারা মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন। চিকিৎসা পেতে গিয়ে যদি অবহেলা, দেরি ও উপেক্ষার শিকার হন, তাহলে তাদের আশা আরও ম্লান হয়ে যায়।
একটু সহানুভূতি, একটি আশ্বাসের বাক্য—রোগীর মনোবল অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে।
আমরা যদি সবাই মিলে একটু মানবিক হতে পারি, তাহলে “অপেক্ষা” শব্দটি যন্ত্রণার নয়, আশার প্রতীক হয়ে উঠবে।
সমাজের প্রতি আহ্বান
আমাদের প্রত্যেকের উচিত রোগীর সময় ও কষ্টকে শ্রদ্ধা করা।
চিকিৎসা সেবা শুধু ব্যবসা নয়—এটি মানবতার অংশ।
চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন—সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে “অপেক্ষা” কমবে, “বিশ্বাস” বাড়বে।
রোগীর চোখে ভরসা ফিরিয়ে দিতে এখনই দরকার সামান্য সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ।