কারাগারে বন্দি ছেলের মুক্তি না মিললেও শেষবারের মতো বাবার মুখ দেখার সুযোগ দিতে কারাগারে আনা হলো মরদেহ—এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে কিশোরগঞ্জে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে জেলা কারাগারে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত স্বজন ও সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার পানাউল্লারচর এলাকার বাসিন্দা মিলন মিয়া (৪৫) বর্তমানে একটি রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দি রয়েছেন। বাবার জানাজায় অংশ নিতে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হলেও তা মঞ্জুর হয়নি। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় বাবার মরদেহ কারাগারের গেটে এনে মিলন মিয়াকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিলন মিয়ার বাবা ফুল মিয়া (৭০) দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ভৈরবের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই পরিবার থেকে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, মিলন মিয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত এক হামলার ঘটনায় করা বিস্ফোরক মামলায় ২০২৪ সালে আটক হন। ওই মামলায় চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি তার জামিন মঞ্জুর হলেও কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। পরে ২৬ জানুয়ারি তাকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে পুনরায় কারাগারে আটক রাখা হয়।
পরিবার ও আইনজীবী সূত্রে বলা হয়েছে, বাবার জানাজায় অংশ নেওয়ার মানবিক আবেদন জানিয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের কাছে প্যারোল চাওয়া হয়। তবে আবেদন নামঞ্জুর করে মরদেহ কারাগারে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মিলন মিয়ার চাচা মতিউর রহমান বলেন, “কারাগারের ভেতরে বাবার মরদেহ দেখে মিলন বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। অনেক চেষ্টা করেও প্যারোলে মুক্তি আদায় করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হলো, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।”
স্বজনরা জানান, বুধবার সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স জেলা কারাগারে পৌঁছায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে মিলনের এক চাচাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও অন্য স্বজনরা কেবল সাধারণ সাক্ষাতের সুযোগ পান।
চাচাতো ভাই সালাম মিয়া বলেন, “প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূর থেকে মরদেহ এনে কারাগারের গেটে দাঁড়াতে হয়েছে। এই সময় দাফন-কাফনের প্রস্তুতিতে থাকার কথা ছিল, কিন্তু আমাদের আদালত আর কারাগারের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে।”
আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুল মোমেন ভূইয়া তুহিন দাবি করেন, “মিলন মিয়া কোনো মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নন। একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর নতুনভাবে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আটকে রাখা হয়েছে।”
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার রিতেশ চাকমা বলেন, “জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয় থেকে পাওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী কারাগারের গেটে মরদেহ দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই একে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।