
শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে বিদায় নিয়েছেন—এমন প্রেক্ষাপটে তার সময়কার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দারিদ্র্য বিমোচন ও কাঠামোগত সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তা পূরণ হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, তার দায়িত্বকালে দেশে নতুন করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দরিদ্র শ্রেণিতে যুক্ত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংস্থার এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সরকারিভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা সবসময় পাওয়া যায়নি, অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন—অর্থনীতির বেশ কয়েকটি সূচক নিম্নমুখী ছিল।
জানা গেছে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের হার এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগের অর্থবছরে যেখানে জিডিপির ২৪ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, তা পরবর্তী সময়ে ২২ শতাংশের কিছু বেশি পর্যায়ে নেমে আসে বলে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগে আস্থাহীনতা, উচ্চ সুদের হার এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ধীরগতি দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে—এমন তথ্য বেসরকারি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিতরণকৃত ঋণের বড় একটি অংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা আর্থিক খাতে চাপ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় বেশি থাকায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে বলে বিভিন্ন মহল দাবি করছে। ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি থাকলেও মজুরি বৃদ্ধি তার নিচে ছিল—এমন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি চাপে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, বিদায়ী ভাষণে মুহাম্মদ ইউনূস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি ও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবণতার কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি ছিল, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার সক্ষম হয়েছে। তবে সমালোচকদের বক্তব্য, রিজার্ভ বৃদ্ধি হলেও তা শিল্পোৎপাদন ও কর্মসংস্থানে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলেনি।
আরও অভিযোগ রয়েছে, তার সময়কালে কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। যদিও এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফল স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি, সচেতন মহলের দাবি—স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাপী ‘তিন শূন্য’—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ—ধারণা প্রচার করলেও দায়িত্বকালে তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি পাওয়া যায়নি বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।
সব মিলিয়ে, তার বিদায়ের পর অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সংস্কার উদ্যোগ এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী দিনে নীতিনির্ধারকরা কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেন, সেটিই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।