নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত অনলাইন জুয়া চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সিমকার্ড, মোবাইল ডিভাইস ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। একই সঙ্গে চক্রের মূল সমন্বয়কারী হিসেবে অভিযুক্ত একজনসহ মোট ছয়জনকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, সাইবার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ শনাক্ত করা হয়। পরে এসব প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে।
জানা গেছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় একটি রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লা সদরের একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে আরও তিনজনকে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ডিবির দাবি, অভিযানে ৬ হাজার ৫০০টি এমএফএস অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিমকার্ড, আরও ৬৭টি বিভিন্ন অপারেটরের সিম, একটি ল্যাপটপ, ৭০টির বেশি মোবাইল ডিভাইস এবং একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া বিপুল সংখ্যক অ্যাকাউন্টের তথ্য সংরক্ষণের জন্য বড় রেজিস্টার বই ব্যবহার করা হতো বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, অনলাইন জুয়ার লেনদেন পরিচালনায় বিভিন্ন পেমেন্ট সেবা ব্যবহার করা হতো। এসব লেনদেনের একটি অংশ এমএফএস এজেন্ট ও মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার পর তা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সেই অর্থ ব্যবহার করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম থেকে ইউএসডিটি কেনা এবং বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতো বলে জানা গেছে।
ডিবির কর্মকর্তার দাবি, আটক হওয়া চক্রটির মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন হতো। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশভিত্তিক বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন মোট ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হতে পারে, যার একটি বড় অংশ দেশের বাইরে পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এসব তথ্য তদন্তাধীন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার চূড়ান্ত যাচাই সাপেক্ষ বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, চক্রটির মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে একজন বিদেশি নাগরিকের নাম উঠে এসেছে, যিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
ডিবির বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের একজনের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মামলা রয়েছে। অবৈধ আয়ের অর্থে বিলাসবহুল জীবনযাপনের অভিযোগও করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে তিনি নিয়মিত হোটেল পরিবর্তন করতেন এবং একাধিক কক্ষ ভাড়া নিয়ে অবস্থান করতেন বলেও জানানো হয়।
এদিকে, উদ্ধার হওয়া সিমকার্ডগুলোর নিবন্ধিত মালিক, সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট, এজেন্ট এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, অনলাইন জুয়া ও এর মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগের সঙ্গে জড়িত পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হতে পারে।