নিজস্ব প্রতিবেদক:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে পরিচিত মিল্টন সমাদ্দারকে ঘিরে আবারও আলোচনা তৈরি হয়েছে। এবার এক বৃদ্ধ নারীকে আশ্রয় দেওয়ার উদ্দেশ্যে তার পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার সময় এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী হিসেবে উজান টিভির কনটেন্ট ক্রিয়েটর নাহিদ ইসলাম নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে এ অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।
নাহিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অসুস্থ এক বৃদ্ধ নারীর চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে তিনি কয়েক দিন ধরে চেষ্টা করছিলেন। মানুষের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা সংগ্রহ করে ওই নারীকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় বলে তিনি জানান। পরে তাকে মিল্টন সমাদ্দারের পরিচালিত ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’ প্রতিষ্ঠানে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে নাহিদ দাবি করেন।
নাহিদের অভিযোগ, শুরুতে ওই বৃদ্ধাকে প্রতিষ্ঠানে রাখার জন্য মাসিক ১৮ হাজার টাকা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়ার বিষয়ে তারা সম্মত ছিলেন বলেও তিনি জানান। তবে পরে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ওই নারীকে রাখতে অস্বীকৃতি জানানো হয় বলে অভিযোগ করেন নাহিদ। বিষয়টি নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহযোগিতা চেয়ে পোস্ট দেন।
পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে মিল্টন সমাদ্দার তাকে জিডি নিয়ে আসার কথা বলেন এবং বৃদ্ধাকে প্রতিষ্ঠানে রাখার আশ্বাস দেন বলে নাহিদ জানিয়েছেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে তারা বুধবার রাত আনুমানিক ২টা ৩৩ মিনিটে ওই প্রতিষ্ঠানে পৌঁছান বলে তার দাবি।
নাহিদ বলেন, সেখানে প্রথমে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার দেবাশীষের সঙ্গে তাদের কথা হয়। কিছু সময় পর মিল্টন সমাদ্দার সেখানে উপস্থিত হন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তার পোস্ট নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদের অভিযোগ, একপর্যায়ে তাকে গালিগালাজ করা হয় এবং মিল্টন সমাদ্দার তার ওপর শারীরিকভাবে আঘাত করেন। তার চোখে আঘাত করা এবং গেঞ্জি ধরে চড় মারার অভিযোগও করেছেন তিনি। এতে বুকে আঘাতের চিহ্ন তৈরি হয়েছে বলে নাহিদ দাবি করেন।
এ ছাড়া তাকে ছাড়াতে এগিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী তার গলা চেপে ধরেছিলেন বলেও অভিযোগ করেছেন নাহিদ। এতে তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল বলে জানান তিনি। একই সময়ে তার সঙ্গে থাকা ইলিয়াস নামের আরেক ব্যক্তিকেও মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ।
নাহিদের ভাষ্য, ঘটনাস্থলে বেশ কয়েকজন লোক উপস্থিত থাকলেও তারা ছিলেন মাত্র কয়েকজন। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে আশঙ্কায় তিনি পরিচিত কয়েকজনের কাছে লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে রাখেন এবং মোবাইল ফোনে অডিও রেকর্ড চালু করেন বলে জানান। পুরো ঘটনার অডিও তার কাছে রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে একটি স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তাদের কাছে কোনো অর্থ চাওয়া হয়নি—এমন বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে নাহিদের দাবি।
ঘটনার পর বৃদ্ধা নারীকে ওই প্রতিষ্ঠানে রেখে তারা সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন বলে জানান নাহিদ। পরে তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সেখানে চোখ পরীক্ষা ও এক্স-রে করা হয়েছে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে একজন কর্মী বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। ঘটনার সময় রাতে কেউ দায়িত্বে ছিলেন না বলেও ওই কর্মী দাবি করেন। মিল্টন সমাদ্দারের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে মিল্টন সমাদ্দারকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তার বিরুদ্ধে মানবপাচার, ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে অনিয়ম, জমি দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার কথা সেসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং বর্তমান ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছেন। পাশাপাশি ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং সব পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।