ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আমজনতার দলের সদস্য সচিব মো. তারেক রহমান। তিনি দাবি করেছেন, ওই সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার সম্পদ লুটপাট করা হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব অভিযোগ ও প্রশ্ন তোলেন তারেক রহমান বলে জানা গেছে। তার বক্তব্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জনস্বাস্থ্য, বন্দর এবং বিভিন্ন আর্থিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গ উঠে আসে।
তারেক রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ৩৭টি সোলার প্রকল্প বাতিল করা হয়। এসব প্রকল্প বাতিলের পেছনে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে সেগুলো পুরোপুরি বাতিল না করে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে পারত। এগুলো বাতিলের কারণে পরবর্তী সরকারের ওপর বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তৃতীয় গ্যাস টার্মিনাল নিয়েও প্রশ্ন
গ্যাসের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প নিয়েও সমালোচনা করেন তারেক রহমান। তার দাবি, ২০২৪ সালের ৩০ মার্চ সামিটকে বাংলাদেশে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সেই উদ্যোগ বাতিল করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান প্রশ্ন তোলেন, প্রকল্পটিতে কোনো দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তার পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা কাটছাঁটের মাধ্যমে প্রকল্পটি চালু রাখা সম্ভব ছিল কি না, সেটি যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছিল কি না।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন করে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রায় দুই বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে। ফলে আগের প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তে দেশ গুরুত্বপূর্ণ সময় হারিয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার বলে তিনি মনে করেন।
হামের প্রাদুর্ভাব নিয়েও তদন্তের দাবি
জনস্বাস্থ্যের প্রসঙ্গে হামের প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি তুলে ধরেন তারেক রহমান। তার বক্তব্য, সংক্রামক রোগের কারণে শিশু ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু হলে সেটি জনমনে উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো এবং এর পেছনে প্রশাসনিক কোনো ব্যর্থতা বা পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করে থাকলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবিও জানান তিনি।
দুই লাখ কোটি টাকার অভিযোগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও বড় ধরনের অভিযোগ করেন তারেক রহমান। তার দাবি, ওই সময়ে অন্তত দুই লাখ কোটি টাকার সম্পদ লুটপাট করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে এই বিপুল অর্থের অভিযোগের পক্ষে বিস্তারিত প্রমাণ বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হিসাব তার বক্তব্যে উপস্থাপিত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তিনি এই অর্থের উৎস, ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে জনগণের সামনে হিসাব প্রকাশের দাবি জানান।
এ ছাড়া কোনো বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার আগে বন্দরের চার্জ ৬০ টাকা থেকে ৪১ টাকায় কমানো হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে এর পেছনে কী কারণ ছিল—সেটিও খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
সামিট ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গ
সামিটের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারেক রহমান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সামিটের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলেও বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহের বিদ্যমান লাইন বন্ধ করা হয়নি। তাহলে তৃতীয় টার্মিনালের নতুন উদ্যোগ কেন এগিয়ে নেওয়া হলো না, সে প্রশ্নও তিনি করেন।
একই সঙ্গে এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রভাব বা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
এ ছাড়া গ্রামীণফোন, গ্রামীণ ব্যাংক এবং বিভিন্ন এনজিওকে দেওয়া সম্ভাব্য সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সময়ে কী ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, গ্রামীণ ব্যাংক কত বছরের কর অব্যাহতি পেয়েছে এবং সেসব সিদ্ধান্তের পেছনে কী কারণ ছিল—তা প্রকাশের দাবি জানান তিনি।
তারেক রহমানের বক্তব্য, দেশে যখন গ্যাস ও বিদ্যুৎ কেনার জন্য অর্থসংকট রয়েছে, তখন রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সম্পদের ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘটনা ঘটলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কে কী সুবিধা পেয়েছে, কীভাবে পেয়েছে এবং এতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। কোনো অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং রাষ্ট্রের পাওনা অর্থ উদ্ধারের দাবিও জানান তিনি।