নিজস্ব প্রতিবেদক:
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে শুরু থেকেই সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সম্মেলন শেষে সদস্যদের সম্মতির ভিত্তিতে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, যুদ্ধ ও শান্তি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সম্মেলনের আলোচনায় বিশ্ব রাজনীতিতে একক আধিপত্যের পরিবর্তে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের প্রভাব কমানো এবং বিকল্প ব্যবস্থায় লেনদেন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি বাস্তবায়নের পথে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রিকসের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে ডলারের বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনার উদ্যোগ নিলে ব্রিকস সদস্যদের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ফলে এবারের সম্মেলনে বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামোর বিষয়ে আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধ ও সংঘাতের বিষয়েও ব্রিকস নেতারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন। বিশ্বজুড়ে চলমান বিভিন্ন সংঘাত বন্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে। কোনো দেশের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা কিংবা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বক্তব্যেও রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যে এই অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও ব্রিকসের আলোচনায় এসেছে। নিরাপত্তা পরিষদে উন্নয়নশীল ও বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মত দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ভারত, ব্রাজিল ও আফ্রিকার দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনাও এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্ব বাণিজ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একতরফাভাবে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বাণিজ্য ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার প্রবণতার সমালোচনা এসেছে বলে জানা গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সংঘাতে সরাসরি জড়িত নয় এমন দেশগুলোও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও ব্রিকসের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এসব সম্পর্ক ভবিষ্যতে অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্মেলনের মাধ্যমে ভারত ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছে বলে জানা গেছে। শুরুতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের আশঙ্কা থাকলেও ভারত ঐকমত্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।
বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা বিশ্ব অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি ও শুল্কনীতির প্রভাব মোকাবিলায় জোটটি ভবিষ্যতে আরও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে এবারের সম্মেলনকে শুধু অর্থনৈতিক জোটের বৈঠক হিসেবে না দেখে পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থান শক্ত করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে ঘোষণাগুলোর কতটা বাস্তবে কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করা হচ্ছে।