ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
শেরপুর সদর উপজেলার ধলা ইউনিয়নের চাঁন্দেরনগর মসলিমপাড়া গ্রামে ৮৮ বছর বয়সী সাবেক শিক্ষক শামছুল হক ক্বারি স্ত্রীকে নিয়ে মানবেতর পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে দাখিল মাদরাসায় শিক্ষকতা ও স্থানীয় মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালন করলেও বার্ধক্যে এসে নিরাপদ বাসস্থান, খাবার ও চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তিনি।
শামছুল হক ক্বারি চাঁন্দেরনগর কোহাকান্দা এমআর দাখিল মাদরাসায় দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করেছেন। অবসরের আগে তিনি দাখিল থেকে ফাজিল পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন বলে জানান। ২০১৩ সালে অবসর নেওয়ার পর আর্থিকভাবে স্বচ্ছল থাকার সুযোগ হয়নি তার।
বর্তমানে স্ত্রী রেজিয়া বেগমকে নিয়ে যে ঘরে থাকছেন, সেটির অবস্থাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ৭৫ বছর বয়সী রেজিয়া বেগম ঘরের এক পাশে রান্না করেন। দুই কক্ষের ঘরটির একটি অংশ ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে আছে। অন্য অংশের চালও বিভিন্ন জায়গায় নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরে পানি ঢোকে বলে জানানো হয়েছে। সামান্য বাতাসেও পুরো ঘর কেঁপে ওঠে বলে স্থানীয়দের দাবি।
একসময় তাদের আবাদি জমি ছিল। আর্থিক সংকটের কারণে সেসব জমি বিক্রি করতে হয়েছে। পরবর্তীতে বসতভিটাটিও বিক্রি হয়ে যায়। বর্তমানে যে ব্যক্তি জায়গাটি কিনেছেন, তার মানবিক সহায়তায় ওই জমিতেই কোনোভাবে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন বৃদ্ধ দম্পতি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, খাবারের সংকটও তাদের জীবনের নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় একবেলা খাবার জুটলেও অন্য বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। বয়সের কারণে নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও সেই ব্যয় বহন করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
শামছুল হক ক্বারির তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই ছেলে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন এবং তাদের একজন রিকশা চালান। দুই মেয়েরও বিয়ে হয়েছে। সন্তানরা খোঁজখবর নেন কি না জানতে চাইলে তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সংক্ষিপ্তভাবে খোঁজ নেওয়ার কথা জানান। সন্তানদের নিয়ে কোনো অভিযোগ করতে চাননি তিনি। বরং তাদের জন্য দোয়া করেছেন।
অবসরকালীন সুবিধা পাওয়ার বিষয়েও এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। শেরপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রেজওয়ান জানিয়েছেন, অবসরকালীন সুবিধা না পাওয়া মাদরাসাশিক্ষকদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। তবে শামছুল হক ক্বারি সংশ্লিষ্ট সময়ে এমপিওভুক্ত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানা নেই বলে তিনি জানান। এমপিওভুক্তির আওতায় থাকলে নিয়ম অনুযায়ী অবসরকালীন সুবিধার জন্য আবেদন করা যেতে পারে।
এদিকে শেরপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, শামছুল হক ও তার স্ত্রী দুজনই বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। অনলাইন তথ্য অনুযায়ী, তারা ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে এ ভাতা পাচ্ছেন।
শেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক জানিয়েছেন, তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। ঘর মেরামতসহ তাদের জন্য কী ধরনের সহায়তা করা যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন বলে তিনি জানান।
একসময় শিক্ষক, ক্বারি ও ইমাম হিসেবে এলাকায় পরিচিত শামছুল হকের বর্তমান জীবনযাপন স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি নিরাপদ বাসস্থান ও নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা হলে বার্ধক্যের এই সময়টুকু কিছুটা স্বস্তিতে কাটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।