
ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে আরও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে চলমান পর্যটন মহাপরিকল্পনা পর্যালোচনা করে নভেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এরপর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় পর্যটন কাউন্সিলে পরিকল্পনাটি উপস্থাপনের কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী।
শনিবার বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পর্যটন খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সেখানে মহাপরিকল্পনা, পর্যটন খাতের তথ্য সংগ্রহ, ডিজিটাল সেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়।
মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী জানান, পর্যটন মহাপরিকল্পনা তৈরির জন্য দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্যে গিয়ে তথ্য নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তবে পর্যটন খাতের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে পর্যাপ্ত ও সমন্বিত তথ্যের ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে।
এই ঘাটতি পূরণে পর্যটন স্যাটেলাইট হিসাব তৈরির কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের প্রকৃত অবদান এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে আরও নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে পর্যটন খাতের নীতি ও কৌশল নির্ধারণেও এসব তথ্য কাজে লাগানো হবে বলে জানানো হয়েছে।
মহাপরিকল্পনার কাজ অক্টোবরের মধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়ার আশা করা হচ্ছে। নভেম্বরের মধ্যে এটি চূড়ান্ত করার পর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় পর্যটন কাউন্সিলে উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সরকারি বক্তব্যেও দেশের বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা তৈরির কথা জানানো হয়েছে।
পর্যটন খাতের ডিজিটাল রূপান্তরকেও পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পর্যটন গন্তব্য, সেবা, নিরাপত্তা, পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সহজলভ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা ভ্রমণের আগে ঘরে বসেই বিভিন্ন গন্তব্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারবেন এবং ভ্রমণসংক্রান্ত কিছু প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করার সুযোগ পাবেন।
এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রচার ব্যবহারের কথাও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাকে আলাদাভাবে না দেখে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কক্সবাজারকে পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার জানান, কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ হয়েছে এবং টার্মিনাল ভবনের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চালুর প্রস্তুতিও চলছে।
তবে শুধু বিমানবন্দর উন্নয়ন করলেই পর্যটক বাড়বে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর সঙ্গে পর্যটন অবকাঠামো, গন্তব্যের সুযোগ-সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন। কক্সবাজারকে একটি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে আশপাশের বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্যের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য, স্থাপত্য, সংস্কৃতি, খাবার, নদী, পাহাড় ও সমুদ্রকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন পণ্যে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর পাশাপাশি খেলাধুলাভিত্তিক, অ্যাডভেঞ্চার, ধর্মীয়, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের মতো খাতগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। বিনোদন ও সম্মেলনভিত্তিক পর্যটনেও সম্ভাবনা খোঁজা হচ্ছে। বৌদ্ধ পর্যটন নিয়ে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং হালাল পর্যটন ও বাংলাদেশের খাবার-উৎসবকে বিদেশি পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে প্রচারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদেশি ব্লগার, সাংবাদিক ও ইনফ্লুয়েন্সারদের বাংলাদেশে এনে বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্য ঘুরিয়ে দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশের কূটনীতিকদেরও পর্যটন প্রচারে যুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ও বিভিন্ন আয়োজনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পর্যটন গাইডদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ইমিগ্রেশন পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশে প্রবেশের সময় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ হওয়ায় তাদের সেবা ও আচরণ পর্যটকদের অভিজ্ঞতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কাজ করার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সচিব। একই সঙ্গে পর্যটন উন্নয়নে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।




