ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
বরিশালের বাবুগঞ্জে সুগন্ধা নদীর ভাঙন আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের বাজারসংলগ্ন এলাকায় গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাত থেকে শুরু হওয়া ভাঙনে অল্প সময়ের মধ্যেই নদীগর্ভে চলে গেছে পুরোনো মসজিদ, বসতভিটা, দোকান, গাছপালা ও বাবুগঞ্জ খেয়াঘাটের গণশৌচাগারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙন অব্যাহত থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
পশ্চিম ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনে তারা একাধিকবার বসতভিটা হারিয়েছেন। অনেক পরিবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘর সরিয়ে জীবনযাপন করছে। এবার নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় তাদের অনেকেই আবারও ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সরোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী সুমি বেগমের বসতঘরও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। নদীতে তাদের রান্নাঘর ও চুলা চলে যাওয়ার পর বসতঘরের বারান্দা খুলে অন্যের বাড়িতে সরিয়ে রাখা হয়েছে। পরিবারের রান্নার প্রয়োজন মেটাতে নদীর পাড়ের পাশে নতুন করে মাটির চুলা তৈরি করছেন সুমি বেগম। তাদের ভাষ্য, এর আগেও কয়েকবার নদীভাঙনের কারণে ঘর সরাতে হয়েছে। এবারও পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
স্থানীয়দের দাবি, পশ্চিম ক্ষুদ্রকাঠী এলাকায় শতাধিক পরিবার বিভিন্ন সময়ে নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। ভাঙন আরও কয়েক শ ফুট এগিয়ে গেলে বরিশাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দেয়ালও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। একই সঙ্গে বাবুগঞ্জ বাজার, খেয়াঘাটের সংযোগ সড়ক, পন্টুন, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে খেয়াঘাট এলাকায় যাতায়াতের সংযোগ সড়কের কিছু অংশ ভাঙনের কবলে পড়েছে। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে নৌযানে যাত্রী ওঠানামার জন্য ব্যবহৃত পন্টুনও। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভাঙন দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এর প্রভাব বাবুগঞ্জ বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য ও আশপাশের বসতিতে পড়তে পারে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে ভাঙন প্রতিরোধে ওই এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। তবে চলতি বছরের ভাঙনে সেগুলোর অনেক অংশ নদীতে চলে গেছে। ফলে স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা জানিয়েছেন, উপজেলার সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল জানান, বাবুগঞ্জ লঞ্চঘাট এলাকার সুগন্ধা নদীর বাম তীরে ব্যাপক ভাঙন হচ্ছে। এ অংশের জন্য ইতোমধ্যে সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রায় ৩ হাজার ৬২৬ মিটার নদীতীর সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে।
তার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ পেয়েছে এবং এখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। চলতি মাসে প্রকল্পটি অনুমোদনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। পাশাপাশি ভাঙনের বর্তমান পরিস্থিতি, ছবি ও স্থানীয়দের বক্তব্যসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর কথা জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা।
তবে স্থানীয়দের বক্তব্য, স্থায়ী প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে আরও বসতভিটা ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই স্থায়ী প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই জিও ব্যাগ, বালুভর্তি বস্তা কিংবা অন্যান্য জরুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভাঙন অব্যাহত থাকলে প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো বাবুগঞ্জ বাজারসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা অবকাঠামো নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ফলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে নদীভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা।