ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে গত এক বছর ধরে তালবীজ বপন করে চলেছেন স্থানীয় যুবক মোহাম্মদ আবদুল ছবুর। ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষা ও বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্য নিয়ে তিনি এ কাজ করছেন। এর পেছনে রয়েছে কয়েক বছর আগের একটি মর্মান্তিক ঘটনা, যা এখনো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
রায়পুর ইউনিয়নের দোভাষী বাজার-বাইন্যার দীঘি সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি কয়েকজন কিশোর ও তরুণকে সঙ্গে নিয়ে তালবীজ বপন করতে দেখা যায় ছবুরকে। কেউ গর্ত করছেন, কেউ বীজ বসাচ্ছেন, আবার কেউ দূর থেকে বীজ এনে দিচ্ছেন। এভাবেই ধীরে ধীরে সড়কের পাশে তালগাছের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
ছবুর রায়পুর ইউনিয়নের গহিরা এলাকার বাসিন্দা। চট্টগ্রাম নগরীতে তার একটি মোটর ওয়ার্কশপ রয়েছে। ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত থাকার কথা জানা গেছে। আগামী তিন বছরে ৩০ হাজারের বেশি তালবীজ বপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন তিনি।
ছবুরের এই উদ্যোগের শুরু ২০২১ সালের একটি ঘটনার পর। ওই বছরের ১৫ অক্টোবর বিকেলে রায়পুর উপকূলের একটি সমুদ্রসৈকতে তার ছেলে আরিয়ানসহ কয়েকজন শিশু-কিশোর ফুটবল খেলছিল। হঠাৎ ঝড়ো আবহাওয়া শুরু হলে ছেলেকে আনতে সেখানে যান ছবুর। ওই সময় বজ্রপাতে তার ছেলে আরিয়ানের বন্ধু ফোরকান মারা যায় বলে ছবুর জানান।
ঘটনাটি তার ছেলে ও তাকে মানসিকভাবে নাড়া দেয়। এরপর বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর উপায় নিয়ে খোঁজ করতে গিয়ে তালগাছের কথা জানতে পারেন তিনি। তখন থেকেই রাস্তার পাশে তালবীজ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন।
ছবুর জানান, গত বছর চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন আড়ত থেকে প্রায় ১৩ হাজার তালবীজ সংগ্রহ করে বিভিন্ন স্থানে বপন করেছিলেন। তবে সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় প্রথম দফায় প্রায় অর্ধেক বীজ থেকে চারা গজায়নি। এবার তাই বীজ বপনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে নতুন করে কাজ করছেন।
তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছর রায়পুর ইউনিয়নে তালগাছের পাশাপাশি কিছু ঔষধি গাছও লাগানো হবে। প্রতি বছর অন্তত সাত থেকে আট হাজার বীজ বপনের লক্ষ্য রয়েছে। ইউনিয়নের কাজ শেষ করার পর আনোয়ারা উপজেলার অন্যান্য এলাকাতেও এই উদ্যোগ ছড়িয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
পুরো কাজের ব্যয় নিজেই বহন করছেন ছবুর। কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবকও তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে স্থানীয়দের কেউ কেউ এ উদ্যোগ নিয়ে নানা মন্তব্য করলেও এখন অনেক তরুণ ও কিশোর স্বেচ্ছায় তাকে সহযোগিতা করছেন।
আনোয়ারা উপজেলা উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সরওয়ার আলম বলেন, তালগাছ বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় তালগাছের ভূমিকা রয়েছে। রাস্তার পাশে বেশি করে তালগাছ লাগানো হলে তা পরিবেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ফোরকানের মৃত্যুর কয়েক বছর পর সেই স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়েই ছবুরের এই উদ্যোগ এগিয়ে চলছে। তার লক্ষ্য শুধু নিজের ইউনিয়নের রাস্তার পাশে গাছ লাগানো নয়, ধীরে ধীরে উপজেলার আরও এলাকায় এ ধরনের বৃক্ষরোপণ ছড়িয়ে দেওয়া।