ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
দেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা ধরে রাখতে গিয়ে বারবার হাতে মানচিত্র আঁকতে হতো তরুণ ভ্রমণপ্রেমী মো. সাব্বির হোসাইনের। সময়সাপেক্ষ সেই কাজ সহজ করতে নিজের প্রয়োজন থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করেন একটি ডিজিটাল ওয়েব অ্যাপ। ‘আনসিন বাংলাদেশ’ নামের এই প্ল্যাটফর্মে এখন কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করেই একজন ভ্রমণকারী তার ঘুরে দেখা জেলার হিসাব রাখতে এবং তা রঙিন মানচিত্রে উপস্থাপন করতে পারছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সাব্বির পেশায় অ্যাপ ডিজাইনার। নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার এই তরুণ বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরে পরিবারের সঙ্গে থাকেন। পড়াশোনা ও পেশাগত কাজের পাশাপাশি নতুন নতুন জায়গা ঘুরে দেখা তার অন্যতম আগ্রহ। ভ্রমণের পর কোন কোন জেলা দেখা হয়েছে, তা সংরক্ষণের জন্য আগে তাকে নিজেই মানচিত্র এঁকে হিসাব রাখতে হতো।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই সহজ কোনো ডিজিটাল সমাধানের চিন্তা আসে তার মাথায়। শুরুতে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হলেও পরে তিনি মনে করেন, দেশের অন্য ভ্রমণকারীদেরও এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। এরপর ওয়েব অ্যাপটি সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
‘আনসিন বাংলাদেশ’-এ দেশের আট বিভাগের ৬৪ জেলার তালিকা রয়েছে। ব্যবহারকারীরা তালিকা থেকে জেলা নির্বাচন করতে পারেন। চাইলে মানচিত্রে সরাসরি ক্লিক অথবা সার্চ করে নির্দিষ্ট জেলা খুঁজে নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। কোনো ব্যক্তি ৬৪ জেলার মধ্যে ১৫টি ঘুরে থাকলে নির্বাচনের পর তার সামনে ১৫/৬৪ হিসাবটি দেখা যায়। একসঙ্গে সব জেলা নির্বাচন এবং আগের নির্বাচন মুছে ফেলার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
শুধু ভ্রমণ করা জেলার সংখ্যা দেখানোতেই প্ল্যাটফর্মটির কার্যক্রম সীমাবদ্ধ নয়। নির্দিষ্ট কোনো জেলা নির্বাচন করলে সেখানে থাকা ইতিহাস-ঐতিহ্য, দর্শনীয় স্থান, স্থানীয় খাবার ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের তথ্য পাওয়া যায়। দর্শনীয় স্থানের ক্ষেত্রে গুগল ম্যাপের অবস্থানসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দেখার ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষায় তথ্য দেখার সুবিধা থাকায় বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারকারীর জন্য এটি কাজে লাগতে পারে।
নিজের ভ্রমণ মানচিত্রকে আরও ব্যক্তিগত করে তুলতে রয়েছে পাঁচটি থিম। ব্যবহারকারী সেখানে নিজের নাম ও ছবি যুক্ত করতে পারেন। নাম না দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘আমার বাংলাদেশ’ লেখা থাকে। তৈরি করা মানচিত্র পিএনজি, জেপিজি কিংবা পিডিএফ ফরম্যাটে সংরক্ষণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করার সুযোগও রয়েছে।
ভবিষ্যৎ ভ্রমণের পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও এআইভিত্তিক সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। ‘ট্রিপ প্ল্যান’ অপশনে একজন ব্যবহারকারী যে জেলাগুলো ঘুরতে চান, সেগুলো নির্বাচন করলে অ্যাপের এআই ট্রিপ প্ল্যানার সম্ভাব্য ভ্রমণসূচি সাজিয়ে দেয়। একাধিক জেলা নির্বাচন করলে কোন গন্তব্যের পর কোথায় যাওয়া সুবিধাজনক, থাকার সম্ভাব্য হোটেল, মানচিত্রের অবস্থান এবং আনুমানিক খরচের মতো বিষয়ও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
সাব্বিরের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ওয়েব অ্যাপটি তৈরি করতে তার প্রায় ১৫ থেকে ১৬ দিন সময় লেগেছে। এআইভিত্তিক কোডিং সুবিধার পাশাপাশি নিজের ডিজাইন দক্ষতাও কাজে লাগিয়েছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রমণপ্রেমীদের মধ্যে অ্যাপটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হলেও এটি থেকে বাণিজ্যিক আয় বা বিজ্ঞাপন নেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন সাব্বির। তার লক্ষ্য ব্যবহারকারীদের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও সহজ অভিজ্ঞতা তৈরি করা। ভবিষ্যতে দেশের পর্যটন খাতের সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগকে যুক্ত করারও আগ্রহ রয়েছে তার।
ভ্রমণকারীদের অনেকে বলছেন, দেশের বিভিন্ন জেলা ঘোরার পর সঠিক হিসাব রাখা এবং কোন কোন জেলা এখনো দেখা হয়নি তা বুঝতে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে একটি দৃশ্যমান মানচিত্রে রূপ দিয়ে পরিচিতদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগও ব্যবহারকারীদের কাছে আকর্ষণ তৈরি করছে।
ভ্রমণপ্রেমীদের পাশাপাশি দেশের পর্যটন ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও উদ্যোগটি নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভ্রমণ পরিকল্পনায় যাতায়াত, আবাসন, সম্ভাব্য ব্যয়, দর্শনীয় স্থান ও স্থানীয় সংস্কৃতির তথ্য সহজে পাওয়া গেলে পর্যটকদের প্রস্তুতি নেওয়া আরও সুবিধাজনক হতে পারে।
সাব্বিরের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে উদ্যোগটি আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনা সম্পর্কে মানুষ সহজে জানতে পারবেন। বিশেষ করে যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে ভ্রমণ শুরু করতে চান, তাদের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এটি আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।