
ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান কোনো দেশের জনগণ বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়; বরং তারা আধিপত্যবাদী নীতির বিরোধিতা করেন। বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও চুক্তি হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার অডিটোরিয়ামে শহীদ আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘আবরার ফাহাদ : দিল্লির আধিপত্যবাদ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন আসিফ মাহমুদ।
তিনি বলেন, অতীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থের তুলনায় ভারতের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে তারা মনে করেন। এ কারণে তাদের অবস্থানকে ভারতবিরোধী হিসেবে দেখার পরিবর্তে আধিপত্যবিরোধী অবস্থান হিসেবে বোঝার আহ্বান জানান তিনি।
আসিফ মাহমুদের ভাষ্য, ভারতকে ঘিরে সরকারের বর্তমান নীতির বিষয়ে এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতের আধিপত্যবিরোধী রাজনীতি বুঝতে আবরার ফাহাদের রাজনৈতিক চিন্তা ও তার আলোচিত আটটি স্তম্ভকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা বলেন তিনি।
আলোচনায় নিজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন এনসিপির এই নেতা। তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাকে নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা তৈরি হয়েছিল বলে জানান তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, তিন বছরে ৮ হাজার তরুণকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কাঠের অস্ত্র ব্যবহার করে প্রশিক্ষণের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এ উদ্যোগকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে যে আলোচনা ও আপত্তি তৈরি হয়েছিল, সেটিও বক্তব্যে তুলে ধরেন তিনি।
আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, দেশের রাজনীতিতে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য অনেকেই বিভিন্ন সময় বিদেশি স্বার্থের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করেন বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, ব্যক্তিগত বা দলীয় সুবিধার চিন্তা থেকে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
সিকিমের রাজনৈতিক ইতিহাসের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের অবস্থানগত পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রভাব একসময় রাষ্ট্রের ওপরও পড়তে পারে। তাই জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির প্রসঙ্গও বক্তব্যে আসে। এ ধরনের চুক্তি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোন পক্ষ কতটা সুবিধা পাচ্ছে, বাংলাদেশের জন্য কী লাভ হচ্ছে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি কী—এসব বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি বা সমঝোতা করাই আপত্তির বিষয় নয়। চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ কতটা রক্ষা হচ্ছে, সেটিই মূল বিবেচনা হওয়া উচিত। ভারতের সঙ্গেও যদি পানি বণ্টনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের জন্য পারস্পরিক সুবিধাজনক সমঝোতা করা সম্ভব হয়, তাহলে সেটিকে ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পানি নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে আসিফ মাহমুদ বলেন, এসব বিষয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে কার্যকর সমঝোতা হলে তা দেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে কোনো চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থের তুলনায় অন্য পক্ষকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে তারা তার বিরোধিতা করবেন বলে জানান।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি শুধু ভারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বা চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করে কোনো পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার মতো চুক্তির বিষয়ে তারা সমালোচনামূলক অবস্থান রাখবেন বলেও জানান তিনি।
আসিফ মাহমুদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে দেশভিত্তিক বিরোধিতার পরিবর্তে বাংলাদেশের স্বার্থ, সম্ভাব্য লাভ এবং ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেওয়া। তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই নীতিকে শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত করা প্রয়োজন।




