নিজস্ব প্রতিবেদক:
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক—দুই ধাপেই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন চট্টগ্রামের ক্লীন্টন সাহা। থানাভিত্তিক মেধাক্রমেও তাঁর অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। নিয়োগের জন্য সুপারিশ পাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত হাতে পাননি নিয়োগপত্র। তাঁর দাবি, স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে জটিলতার কারণে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
ক্লীন্টন সাহার বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায়। তবে ছোটবেলা থেকেই নদীভাঙনের কারণে তাঁদের পরিবারকে একাধিকবার বসতভিটা বদলাতে হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় সাতবার নদীভাঙনে তাঁদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা বিলীন হয়েছে। পরে পরিবারের থাকা বাড়িটিও বিক্রি হয়ে যায়। প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে তাঁরা চট্টগ্রাম নগরে বসবাস করছেন। বর্তমানে তাঁদের নিজস্ব স্থায়ী বসতভিটা নেই বলে জানান ক্লীন্টন।
চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং এলাকার বাসিন্দা ক্লীন্টন বলেন, সরকারি শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত যাচাইয়ের সময় তিনি পরিবারের আগের ঠিকানা ও নদীভাঙনের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছিলেন। এ-সংক্রান্ত জমির দলিলও দেখানো হয়েছিল বলে তাঁর দাবি। পরে নানার বাড়ির ঠিকানাও দেওয়া হয়। এরপরও স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে জটিলতা কাটেনি।
চলতি বছরের মার্চে ডবলমুরিং শিক্ষা থানার জন্য প্রকাশিত নিয়োগ তালিকায় ১২ জনের নাম ছিল। তালিকায় ক্লীন্টনের নাম ছিল ১০ নম্বরে এবং মেধাক্রমের ঘরে তাঁর অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। প্রথম দফায় পাঁচজনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। পরে সেপ্টেম্বরে আরও ছয়জন নিয়োগপত্র পান। কিন্তু ক্লীন্টনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি বলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে আবেদন করতে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান ক্লীন্টন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কার্যালয়ে উপস্থিত না থাকায় তাঁর আবেদন গ্রহণ করা হয়নি বলে তিনি জানান। পরে তিনি কর্মকর্তাকে মুঠোফোনে বিষয়টি জানানোর পাশাপাশি আবেদনটি গ্রহণের অনুরোধ করেছিলেন বলেও দাবি করেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের তালিকায় মোট ৫৫১ জন ছিলেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় তাঁদের মধ্যে ২৪ জন বাদ পড়েন। বাকি ৫২৭ জনের মধ্যে ৫২৫ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে বাকি দুজনের নিয়োগপত্র কেন জারি হয়নি, সে বিষয়ে দপ্তর বিস্তারিত কারণ জানায়নি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফিরোজ আহাম্মদ জানিয়েছেন, নিয়োগসংক্রান্ত কিছু বিষয় গোপনীয় হওয়ায় নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করার এখতিয়ার তাঁদের নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্থায়ী ঠিকানা-সংক্রান্ত জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে কিছু প্রার্থী বাদ পড়তে পারেন। ক্লীন্টন সাহার ক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি, তা দপ্তরের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি। তবে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে জটিলতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
ক্লীন্টন চট্টগ্রাম কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পড়াশোনার সময় টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন বলেও জানান তিনি। বর্তমানে পরিবারের ব্যয়ের বড় একটি অংশ তাঁকে বহন করতে হয়। তাঁর বাবা বয়সজনিত ও শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন বলে জানান ক্লীন্টন।
নিয়োগ না পাওয়ার ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগ্রহও অনেকটা কমে গেছে। লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার পরও স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ক্লীন্টনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি। আবেদন করা হলে তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।