ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সলুয়ায় নির্মিত বর্জ্য পুনর্ব্যবহার প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে সন্তোষজনক ফল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ডিসেম্বর থেকে প্ল্যান্টটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হতে পারে। প্রকল্পটি চালু হলে গৃহস্থালির পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার, পলিথিন ও প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি তেল এবং বায়োগ্যাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ৩ অক্টোবর প্ল্যান্টের পাইরোলাইসিস প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের একটি প্রতিনিধিদল পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পরবর্তী সময়েও পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ চলবে।
তিনি জানান, প্ল্যান্টটি পরিচালনার জন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রথমে প্ল্যান্টের নিজস্ব চাহিদা পূরণে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যে এটি চালু করা সম্ভব হতে পারে।
প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ পাঁচ প্রকৌশলীকে নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়। দলটি ১ অক্টোবর খুলনায় পৌঁছায় এবং ৩ অক্টোবর পরীক্ষার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ শেষে ঢাকায় ফিরে যায়। সদস্যদের মধ্যে বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্রের (বিটাক) সাবেক মহাপরিচালক ড. ইনসানুল করিম, সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী একেএম শামসুল হুদা, প্রকৌশলী মো. আব্দুল জব্বার, সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী মো. আশরাফ উদ্দিন এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল গফুর রয়েছেন।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী পিন্টু মন্ডল জানান, প্রতিনিধিদলের সদস্যরা পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে প্রকল্প পরিচালকের কাছে তাঁদের মতামত তুলে ধরবেন। পরীক্ষার সময় পাইরোলাইসিস প্রযুক্তিতে পলিথিন ও প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি তেল উৎপাদন করা হয়। পরীক্ষার অংশ হিসেবে উৎপাদিত তেলের ১০ লিটার নমুনা পর্যালোচনার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সময় ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে পরিকল্পনা অনুযায়ী টানা ৩৬ ঘণ্টা পাইরোলাইসিস কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। প্রযুক্তির প্রক্রিয়াগত ধাপ অনুযায়ী, প্রায় ছয় ঘণ্টা পর তেল উৎপাদন শুরু হয়। এরপর আরও দুই থেকে তিন ঘণ্টা যন্ত্র চালানোর পর তা বন্ধ করা হয়। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ফলাফলকে প্রাথমিকভাবে সন্তোষজনক বলে মনে করা হচ্ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর আগে পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ডুমুরিয়ার সলুয়া বাজারসংলগ্ন প্রায় ১৭ একর জমিতে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। কেসিসি ও এলজিইডির যৌথ উদ্যোগে দ্বিতীয় নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্পের (সিআরডিপি-২) আওতায় এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকার প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করেছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ কোটি টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড এর নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২০ টন জৈব সার, ৪ হাজার ৮০০ লিটার জ্বালানি তেল এবং বায়োগ্যাস থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে। গৃহস্থালির পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরি করা হবে। অন্যদিকে, পলিথিন ও প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি তেল এবং কাঁচাবাজারের বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম ও প্রযুক্তির কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতিটি ব্যাচের বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। উৎপাদিত তেল ও বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর অন্যত্র সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানিয়েছেন, ডুমুরিয়ার সলুয়ার প্ল্যান্টের পাশাপাশি বটিয়াঘাটা উপজেলার মাথাভাঙ্গায় আরেকটি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার প্রকল্প চালুর প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া রাজবাঁধ ট্রেঞ্চিং গ্রাউন্ডে মেডিকেল বর্জ্য শোধনাগার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব প্রকল্প চালু হলে খুলনা মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পগুলোর প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা, পরিবেশগত প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর পর আরও স্পষ্ট হবে।