ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
কুমিল্লায় স্বাধীনভাবে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল চার স্কুলছাত্রী। বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হলেও তারা আর স্কুলে যায়নি। প্রথমে ঢাকায় গিয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার চেষ্টা করে তারা। কিন্তু সেখানে থাকার ব্যবস্থা করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে চলে যায়। পরে এক অটোরিকশাচালকের সন্দেহের কারণে পুলিশ তাদের সন্ধান পায় এবং উদ্ধার করে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া চার শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজন পঞ্চম শ্রেণিতে এবং একজন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তাদের বয়স কম হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় চার ছাত্রী। তবে নির্ধারিত সময়ে তারা বিদ্যালয়ে উপস্থিত না হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতে পারেন। পরে তাদের সন্ধানে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান শুরু করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধান
চার শিক্ষার্থীর সন্ধান পেতে পুলিশ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণের পাশাপাশি তাদের ছবি ও পরিচয় বিভিন্ন থানায় পাঠানো হয়। একপর্যায়ে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানা-পুলিশের সহযোগিতায় সোমবার দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত মুঠোফোন ব্যবহার করত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে ভিডিও প্রকাশের সূত্রে কয়েকজন তরুণের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ওই তরুণদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা থেকেই শিক্ষার্থীরা বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে যাদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করত, তাদের প্রকৃত অবস্থান ও ঠিকানা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার ধারণা ছিল না বলে পুলিশের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
ঢাকায় বাসা না পেয়ে চুনারুঘাটে যাত্রা
বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর চার ছাত্রী প্রথমে ঢাকায় পৌঁছায়। সেখানে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার চেষ্টা করলেও তারা সফল হয়নি। এরপর তাদের একজনের দাদাবাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।
পুলিশের তথ্য অনুসারে, চুনারুঘাটে পৌঁছে রাতে ঠিকানা খুঁজতে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করছিল শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাদের চলাফেরা ও পরিস্থিতি এক অটোরিকশাচালকের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। পরে তিনি পুলিশকে খবর দেন। সেই খবরের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে চার শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে।
ঘটনাটি দেখিয়েছে, অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর বাস্তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সিদ্ধান্ত শিশু-কিশোরদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে দূরের কোনো স্থানে চলে গেলে নিরাপত্তা, যাতায়াত ও থাকার ব্যবস্থা নিয়ে জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
পরিবারের মূল্যবান সামগ্রী নেওয়ার তথ্য
পুলিশ আরও জানিয়েছে, বাড়ি ছাড়ার সময় শিক্ষার্থীরা পরিবারের কিছু মূল্যবান জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়েছিল। তাদের একজন পরিবারের ব্যবহৃত একটি অ্যান্ড্রয়েড মুঠোফোন কুমিল্লার টাউন হল মার্কেটের একটি দোকানে চার হাজার টাকায় বিক্রি করে বলে পুলিশের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পুলিশ ওই ফোনটি উদ্ধার করে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকারও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
ঘটনার পর অভিভাবকদের সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। তাঁর মতে, সন্তানদের দৈনন্দিন চলাফেরা, অনলাইন যোগাযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
তবে শুধু নজরদারি নয়, সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশু-কিশোরেরা যেন কোনো সমস্যা, ভয় কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কথা পরিবারের সদস্যদের নির্দ্বিধায় জানাতে পারে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের মনোযোগী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।