ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখতে দেশের ৩১ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি নিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। আগুনসহ যেকোনো দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সংস্থাটির জনবল, যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দ্রুত জরুরি সেবা পৌঁছে দিতে পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন পূজামণ্ডপের কাছাকাছি ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট ও সরঞ্জাম রাখার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীতে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তুতির কথা জানান সংস্থাটির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ। শারদীয় দুর্গাপূজায় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
মহাপরিচালক জানান, অতীতের দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য ঝুঁকির জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পূজামণ্ডপের আয়োজকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেও কাজ চলছে।
তিনি বলেন, উৎসবকে কেন্দ্র করে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্কতা ও সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, পূজামণ্ডপে অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম ঝুঁকি তৈরি হতে পারে অস্থায়ী প্যান্ডেল নির্মাণ ও বৈদ্যুতিক সংযোগের ক্ষেত্রে। নিম্নমানের তার ব্যবহার, ত্রুটিপূর্ণ সংযোগ এবং বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার সক্ষমতা বিবেচনা না করে অতিরিক্ত লোড নেওয়ার কারণে আগুন লাগার আশঙ্কা থাকে। কোনো কোনো স্থানে বৈদ্যুতিক সংযোগের উপযোগিতা যাচাই না করেই শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এসব বিষয়ে আয়োজকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া পূজামণ্ডপের আশপাশে রান্নাবান্না ও খাবার তৈরির জায়গা থেকেও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই রান্নার স্থান নির্ধারণ, আগুনের ব্যবহার এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের ওপর জোর দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
দেশের ৫৩৮টি ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট পূজা কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। তাঁদের মাধ্যমে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই করা হয়েছে। পাশাপাশি আয়োজকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া এবং আগুন লাগলে প্রাথমিকভাবে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, সে বিষয়ে ধারণা দেওয়ার কার্যক্রমও চলছে।
জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পেতে ফায়ার সার্ভিসের ১০২ হটলাইন নম্বর সম্পর্কে প্রচার চালানো হচ্ছে। স্টেশন পর্যায়ে কর্মকর্তা, ফায়ার লিডার ও অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো যায়।
প্রতিটি পূজামণ্ডপে অগ্নিনিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের জন্য একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মহাপরিচালক। তাঁর মতে, কোথাও আগুন লাগলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি দ্রুত মণ্ডপের লোকজন ও ফায়ার সার্ভিসকে জানাতে পারবেন। প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এবং পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পৌঁছালে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
দূরবর্তী এলাকার পূজামণ্ডপগুলোতেও জরুরি সেবা পৌঁছানোর বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায় থেকে প্রয়োজনের কথা জানানো হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জনবল ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম আগাম প্রস্তুত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের জরুরি সাড়া নিয়ন্ত্রণ সেলের পাশাপাশি বিভাগীয় পর্যায়েও নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু রেখে সমন্বয় ও সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মহাপরিচালক আরও বলেন, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু ফায়ার সার্ভিসের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। পূজার আয়োজক, অংশগ্রহণকারী ও দর্শনার্থীদেরও সচেতন থাকতে হবে। ধূপ জ্বালানোসহ আগুন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন এবং অগ্নিকাণ্ডের সময় করণীয় সম্পর্কে সবার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বিভিন্ন পূজামণ্ডপে গিয়ে নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা এবং সময়মতো দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দুর্গাপূজা নিরাপদে সম্পন্ন করা সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।