ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ ও ভোট দেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অর্থবিল, আস্থা-অনাস্থা প্রস্তাব, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো চারটি নির্দিষ্ট বিষয় ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন সংসদ সদস্যরা। জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে এমন প্রস্তাব নিয়ে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে আলোচনা হয়েছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির নবম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।
বৈঠকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, আইন বিভাগের অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদসহ প্রায় অর্ধশত বিশিষ্ট ব্যক্তি অংশ নেন। আলোচনায় সংবিধানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। এর মধ্যে ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্গঠন, সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সভাগুলোর মধ্যে এবারের আলোচনা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে সমৃদ্ধ। সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বিস্তারিত মতামত দিয়েছেন। বিশেষ করে বিচারিক পর্যালোচনা, প্রশাসনিক আদেশের ওপর আদালতের এখতিয়ার এবং সাংবিধানিক কাঠামোর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে একাধিক প্রস্তাব
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের সম্ভাব্য কাঠামো নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ ব্যবস্থার গঠনপ্রক্রিয়া, কার্যপরিধি এবং পরিচালনার রূপরেখা কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব উঠে এসেছে।
প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষের ভূমিকা নিয়েও মতামত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। উচ্চকক্ষ কার্যকর হলে শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে স্পিকার কিংবা অন্য কোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কাঠামো নির্ধারণ করা যেতে পারে বলে আলোচনায় মত এসেছে।
তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কিংবা উচ্চকক্ষের কাঠামো নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের লিখিত মতামত পাওয়ার পর সেগুলো পর্যালোচনা করে কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে বলে জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি।
সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার ও বিচার বিভাগের সংস্কার
৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে আলোচনায় চারটি ক্ষেত্রকে ব্যতিক্রম হিসেবে রাখার প্রস্তাবের কথা জানান সালাউদ্দিন আহমদ। অর্থবিল, আস্থা বা অনাস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মতামত ও ভোট দিতে পারবেন বলে প্রস্তাবিত কাঠামোয় উল্লেখ রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন। তবে প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হতে সংবিধান সংশোধনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচারক নিয়োগের আইনগত পদ্ধতি নিয়েও বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সভাপতির পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্যের কথা তুলে ধরা হয়। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করার বিষয়েও প্রস্তাব এসেছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বিধান কিংবা আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার ধারণা আলোচনায় স্থান পেয়েছে।
সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা
সংবিধান সংশোধন পরিষদ গঠন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংসদ সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংবিধান অনুযায়ী শপথ নিয়েছেন। সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি হিসেবে তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করছেন।
গণভোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবির বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
সব মিলিয়ে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এগোলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো এখনো পর্যালোচনাধীন। বিশেষজ্ঞদের মতামত ও কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্তের বিষয়টি নির্ধারিত হবে।