ক্রাইম এডিশন:
হলিউডের সিনেমা জগতে ব্লকবাস্টার তৈরির স্বপ্ন দীর্ঘদিনের।
১৯৭৫ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘জস’ সিনেমাটি উত্তর আমেরিকার বক্স অফিসে ১০ কোটি ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল।
সেই থেকেই বড় বাজেটের সিনেমা তৈরির পেছনে বিপুল আয়ের লক্ষ্য অবিচল রয়েছে। বাকি দুটি ছবিও সেই মাইলফলকের খুব কাছাকাছি। ‘টাইটানিক’-এর পর আবারও বড় বাজেটের সিনেমা নির্মাণে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন ক্যামেরন।
তবে কোনো চলচ্চিত্র ঠিক কীভাবে শতকোটি ডলারের বাণিজ্য করে, তা নিয়ে ফোর্বসের বিনোদনবিষয়ক লেখক টিম ল্যামারসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক। ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী আয়ের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দর্শকের সঙ্গে গল্পের আবেগঘন সংযোগ এবং জনপ্রিয় চরিত্র বা ফ্র্যাঞ্চাইজির আকর্ষণই মূলত বক্স অফিসে সাফল্যের মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসের হিসাব বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে পরিচিত গল্প, জনপ্রিয় চরিত্র, আবেগ এবং দর্শনীয় নির্মাণশৈলী মিলে তৈরি হয়েছে একেকটি ব্লকবাস্টার। কাল্পনিক গ্রহ প্যান্ডোরার পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিতে দেখা যায়, সাবেক সেনাসদস্য জেক সালি সেখানে গিয়ে এক ভিন্ন জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন। পৃথিবীর মানুষের লোভ ও প্যান্ডোরার প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দাঁড়ান তিনি। এবার প্যান্ডোরার জলজ পরিবেশ ও মেটকায়িনা জনগোষ্ঠীকে ঘিরে এগিয়েছে গল্প। শ্রেণিবৈষম্য, প্রেম, বিচ্ছেদ ও মৃত্যুর মতো সর্বজনীন আবেগ ছবিটিকে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা ১০টি সিনেমার তালিকায় মুদ্রাস্ফীতি বা টিকিটের দাম সমন্বয় না করেই যে হিসাব করা হয়েছে, তাতে দেখা যায় আটটি ছবিই ২০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল মুক্তি পাওয়া ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’, যার আয় ২৯৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। ২০০৯ সালের জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার’ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে আছে ২৯২ কোটি ৩০ লাখ ডলার আয় নিয়ে। এরপর রয়েছে ২০২৬ সালের ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ (২৫১ কোটি ৯০ লাখ ডলার), ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’ (২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার), চীনা অ্যানিমেশন ‘নে ঝা ২’ (২২৭ কোটি ডলার) এবং ১৯৯৭ সালের ‘টাইটানিক’ (২২৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার)। ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ (২০১৯)—২৯৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। ‘অ্যাভাটার’ (২০০৯)—২৯২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ (২০২৬)—২৫১ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’ (২০২২)—২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ‘নে ঝা ২’ (২০২৫)—২২৭ কোটি ডলার। 2019, 294, 10, 2009, 292, 30, 2026, 251, 90, 2022, 233, 40, 2, 2025, 227, 1997, 226, 2015, 207, 2018, 205, 20. ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’ (২০২১)—১৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার। ‘জুটোপিয়া ২’ (২০২৫)—১৮৭ কোটি ডলার। আসছে ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’। ‘অ্যাভাটার’ বদলে দিয়েছিল সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা। প্রথম ছবির জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে সিক্যুয়েলটিও বিশ্বব্যাপী ২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় করে। মোট আয়ের প্রায় ২২০ কোটি ৯০ লাখ ডলারই এসেছে দেশটি থেকে। টিকিটের বাড়তি দাম দিয়েও দর্শকেরা সিনেমাটি দেখতে আগ্রহী হয়েছিলেন। তালিকার সেরা ১০ সিনেমার মধ্যে একমাত্র ‘টাইটানিক’ই সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জিতেছে।
‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ সিনেমার সাফল্যের পেছনে ছিল ২০০৮ সালের ‘আয়রন ম্যান’ থেকে শুরু হওয়া এক দশকের দীর্ঘ গল্প। ২০১৮ সালের ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়ার’-এ থানোসের চুটকিতে মহাবিশ্বের অর্ধেক প্রাণের বিলুপ্তির পর, বাকিদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই দর্শকদের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। যদিও ২০২৪ সালে মার্ভেল ঘোষণা দেয় যে অ্যাভেঞ্জাররা ফিরছে, তবে এন্ডগেমের মহাকাব্যিক সমাপ্তি ভক্তদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার চূড়ান্ত প্রতিফলন ছিল। হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ফিরিয়ে আনতে অ্যাভেঞ্জাররা শুরু করে সময়ভ্রমণের এক বিপজ্জনক অভিযান।
জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার’ সিরিজের প্রতিটি কিস্তিই বক্স অফিসে অভাবনীয় সাড়া ফেলেছে। ২০০৯ সালের মূল ছবিটির ১৩ বছর পর মুক্তি পায় ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’। প্যান্ডোরা গ্রহের পটভূমিতে জেক সালি ও নাভি জনগোষ্ঠীর সংগ্রামের গল্প এবং ক্যামেরনের ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে টানতে সক্ষম হয়েছিল। ক্যামেরনের পরিচালনায় ‘টাইটানিক’, ‘অ্যাভাটার’ এবং ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’—এই তিনটি ছবিই ২০০০ কোটি ডলারের বেশি আয়ের রেকর্ড গড়েছে। ফলে প্রিয় চরিত্রগুলোর বিদায়, ত্যাগ ও আবেগঘন পরিণতি দেখতে প্রেক্ষাগৃহে ভিড় করেছিলেন তাঁরা। নাভি জনগোষ্ঠীর সদস্য নেইতিরির প্রেমে পড়ে ধীরে ধীরে বদলে যায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।
চীনা অ্যানিমেশন ‘নে ঝা ২’-এর সাফল্যও বিশ্বমঞ্চে বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। ইউ ইয়াং পরিচালিত এই অ্যাকশন-ফ্যান্টাসি ছবিটি ২০১৯ সালের জনপ্রিয় প্রথম পর্বের ধারাবাহিকতা। চীনের বাজারের ব্যাপক চাহিদার কারণেই ছবিটি ২২৭ কোটি ডলার আয় করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ‘টাইটানিক’ তালিকার অন্যান্য সিনেমার চেয়ে কিছুটা আলাদা, কারণ এটি ফ্যান্টাসি বা কল্পবিজ্ঞানের পরিবর্তে ১৯১২ সালের ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ও কেট উইন্সলেটের রসায়নে ১৯১২ সালে আটলান্টিকের ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি বাণিজ্যিক ও শিল্পগত—উভয় দিক থেকেই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ১১টি অস্কার বিজয়ী এই ছবি আজও দর্শকের কাছে আবেগের সমার্থক। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ও কেট উইন্সলেট অভিনীত ছবিটিতে জ্যাক ও রোজের প্রেমের গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১৯১২ সালে আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে যাওয়া টাইটানিক জাহাজের মর্মান্তিক ঘটনা। ১১টি অস্কার জেতা ছবিটি শিল্প ও বাণিজ্য—দুই ক্ষেত্রেই বিরল সাফল্য পেয়েছে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শীর্ষ ১০ সিনেমার নয়টিই আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি বা পরিচিত ঘরানার অংশ। সুপারহিরো চলচ্চিত্রের আধিপত্য এখানে স্পষ্ট, যেখানে ‘অ্যাভেঞ্জার্স’ ও ‘স্পাইডার-ম্যান’-এর একাধিক ছবি রয়েছে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সম্পূর্ণ নতুন গল্পে বিনিয়োগের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে প্রতিষ্ঠিত চরিত্রের ওপর ভরসা করা অনেক বেশি নিরাপদ ও লাভজনক। কারণ, অন্য ছবিগুলোর অধিকাংশই কল্পবিজ্ঞান, সুপারহিরো কিংবা ফ্যান্টাসিনির্ভর।
সুপারহিরো ঘরানার প্রতি দর্শকের আগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়ায় যাকে ‘সুপারহিরো ফ্যাটিগ’ বলা হচ্ছে, সেই প্রবণতাও মার্ভেলের সাম্প্রতিক ব্যবসায়িক সাফল্যে প্রভাব ফেলেছে। ২০১৯ সালের পর থেকে মার্ভেলের অনেক ছবি আগের সেই জৌলুস দেখাতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেস’ এবং ‘ব্ল্যাক প্যান্থার: ওয়াকান্ডা ফরএভার’ কিছুটা আশার আলো দেখালেও সামগ্রিক ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন নির্মাতাদের ভরসা ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’-এর মতো ছবি, যেখানে পুরনো জনপ্রিয় তারকারা আবারও ফিরে আসছেন। রবার্ট ডাউনি জুনিয়র, ক্রিস ইভানস, ক্রিস হেমসওয়ার্থ ও স্কারলেট জোহানসনের মতো তারকারা অভিনয় করেছেন এতে।
বক্স অফিসে সাফল্যের কোনো নির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্র নেই। বড় বাজেট কিংবা বড় তারকা থাকলেই যে সিনেমা সফল হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালে টম ক্রুজ অভিনীত ‘ডিগার’ সিনেমাটি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। বিপরীতে, স্বল্প বাজেটের ছবি যেমন ‘ব্যাকরুমস’ (খরচ ১ কোটি ডলার) বিশ্বব্যাপী ৪০ কোটি ডলার আয়ের রেকর্ড গড়েছে। তাই দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হলে গল্পের সঙ্গে একাত্ম হওয়া এবং আবেগের সংযোগ ঘটাতে পারাই আসল চাবিকাঠি। অর্থাৎ হলিউডের বাইরের একটি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পুরাণভিত্তিক অ্যানিমেশনও যে বিশ্ব বক্স অফিসে বড় সাফল্য পেতে পারে, তার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে ‘নে ঝা ২’।