চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর জেরে সৃষ্ট তীব্র আন্দোলনের অবসান ঘটেছে। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা ধরে চলা রেল ও সড়কপথের অবরোধ শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের সরাসরি হস্তক্ষেপে প্রত্যাহার করে নেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধ বিকেল চারটার দিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার আশ্বাসে তুলে নেওয়া হয়। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ৬ ঘণ্টা পর আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) শিক্ষার্থীদের রেল ও সড়কপথ অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এর আগে সকাল নয়টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন ডালাস পেট্রোল পাম্পের বিপরীতে একটি লরির ধাক্কায় একটি লোকাল বাস উল্টে যায়। এ সময় বাসের নিচে চাপা পড়েন কয়েকজন শিক্ষার্থী। গুরুতর আহত অবস্থায় ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাতকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই দুর্ঘটনায় আরও দুজন শিক্ষার্থী আহত হন।
সহপাঠীর মৃত্যুর খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীরা সকাল সাড়ে ১১টার দিকে প্রথমে মহাসড়ক এবং পরে রেলপথেও অবস্থান নেন। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয় এবং রেল চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে দূরপাল্লার যাত্রী, সাধারণ মানুষ ও জরুরি সেবার অ্যাম্বুলেন্সসহ অসংখ্য যানবাহন দীর্ঘ সময় আটকে চরম দুর্ভোগে পড়ে।
পরিস্থিতি শান্ত করতে দুর্ঘটনার পরপরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা আহত শিক্ষার্থীর সুচিকিৎসার বিষয়ে হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নিহত মাইশার বাবা দিদারুল আলমের সঙ্গে কথা বলে সমবেদনা জানান। পাশাপাশি তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন।
পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। এরপর সেখানে আসেন পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বিপিএম, আনসার ও ভিডিপির জেলা কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ শিক্ষক ও কর্মকর্তারা। নিহত মাইশার জানাজায় অংশ নিয়ে শোকাহত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান জেলা প্রশাসক এবং তাদের সঙ্গে কথা বলে শান্ত করার চেষ্টা করেন।
শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে একটি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করা। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হতে হয় উল্লেখ করে তারা এই স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, আজকেই ফুটওভারব্রিজের নির্মাণের জন্য লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হবে এবং সড়কের দুই পাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
মহাসড়কে অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ডিসি জানান, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান রাস্তা দখল করে লরি বা গাড়ি রাখতে পারবে না। এ ধরনের অবৈধ পার্কিং কঠোরহাতে দমন করা হবে। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি রাস্তা দখল করে লরি বা গাড়ি রাখে, সেগুলো আমরা রাস্তায় কিছুতেই রাখতে দেব না।
এদিকে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বিপিএম জানান, দুর্ঘটনায় জড়িত লরিটি ইতিমধ্যে পুলিশ জব্দ করেছে। তবে চালক পালিয়ে যাওয়ায় তাকে দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পুলিশ সুপারের এই আশ্বাসের বিষয়টি নিশ্চিত করে জেলা প্রশাসক অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
নিহত শিক্ষার্থীর বিচার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আট দফা দাবি উত্থাপন করেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লরিচালককে গ্রেপ্তার, চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, মহাসড়কের উভয় পাশে গতি নিরোধক স্থাপন, ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, কেডিএস ডিপোর অবৈধ পার্কিং বন্ধ এবং মহাসড়ক ও রেললাইনের পাশের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ।