চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় যশোর উপশহর কলেজের পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘটেছে এক অনভিপ্রেত ঘটনা। ২০২৬ সালের শিক্ষার্থীদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে ২০২৫ সালের অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়। এর ফলে আইসিটি পরীক্ষায় ৩৮ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তবে এই ঘটনার কোনো দায় নিতে অস্বীকার করেছে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এদিকে পরীক্ষা কেন্দ্র ও কলেজ কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও এক বছর হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। আমার ছেলেটার জীবন থেকে এক বছর চলে যাচ্ছে। ”।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জুলাই সকাল ১০টায় আইসিটি (বিষয় কোড: ২৭৫) পরীক্ষা চলাকালে যশোর উপশহর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। ওই কেন্দ্রে উপশহর কলেজের মোট ২৭৯ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। পরীক্ষার নির্ধারিত সময়ে উপশহর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে প্রশ্নপত্রের ঘাটতি দেখা দিলে কেন্দ্র থেকে অতিরিক্ত প্রশ্ন এনে ৩০৩ নম্বর কক্ষে উপস্থিত ৩৮ জন নিয়মিত শিক্ষার্থীর মধ্যে তা বণ্টন করা হয়। কিন্তু মাত্র ২৫ মিনিটের নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষা শেষের দিকে পরীক্ষার্থীরা খেয়াল করেন যে, তাদের দেওয়া প্রশ্নপত্রটি মূলত ২০২৫ সালের অনিয়মিতদের সিলেবাস অনুযায়ী করা। ঘটনাটি টের পেয়ে পরীক্ষার্থীরা কক্ষে প্রতিবাদ ও হইচই শুরু করেন এবং পরবর্তীতে কেন্দ্র ডিন ও উপশহর কলেজ কর্তৃপক্ষকে ঘটনাটি অবহিত করেন। এর মধ্যে কখন সময় শেষ হয়েছে টের পাইনি।
ঘটনার দিন বিকেলেই যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম হোসেন আলীসহ কর্মকর্তারা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রে পৌঁছান। এরপরই দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কেন্দ্র সচিব ও উপশহর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান এবং সহকারী অধ্যাপক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলামকে তাত্ক্ষণিকভাবে পরীক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি, সে সময় বোর্ড কর্মকর্তারা পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছিলেন, যার ওপর ভরসা রেখে শিক্ষার্থীরা অবশিষ্ট বিষয়গুলোর পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। এরপর শিক্ষার্থীরা অন্যান্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। বিষয়টি অধ্যক্ষ স্যার বেশি ভালো বলতে পারবেন। ”।
তবে গত ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত ফলাফল হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরে। যশোর উপশহর ডিগ্রি কলেজ থেকে অংশ নেওয়া ২৭৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ৪৯ জন, যা শতকরা হিসাবে মাত্র ১৭.৫৬ শতাংশ। মোট অকৃতকার্য হওয়া ২৩০ জনের মধ্যে সেই ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দেওয়া ৩৮ জন শিক্ষার্থীও রয়েছেন, যারা সবাই আইসিটি বিষয়ে ‘এফ’ গ্রেড পেয়েছেন। ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেওয়ায় অকৃতকার্য ৩৮ শিক্ষার্থীর রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করে বোর্ডের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন উপশহর কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পরীক্ষার্থী অর্ক জানান, ২৫ মিনিটের নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষার জন্য সরবরাহ করা প্রশ্ন পেতে তাদের প্রায় ১০ মিনিট দেরি হয়েছিল। সময় কম থাকায় তাড়াহুড়ো করে উত্তর দিতে গিয়ে প্রশ্নপত্র যে আগের বছরের তা লক্ষ্য করা সম্ভব হয়নি। পরীক্ষা শেষে কক্ষের বাইরে সহপাঠীদের সঙ্গে আলোচনা করেই তারা ভুল প্রশ্নের বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং শিক্ষকদের অবহিত করেন। আইসিটিতে ফেল করা ইয়াসিন বলেন, “প্রশ্নপত্র দিতে দেরি হওয়ায় প্রচুর টেনশন হচ্ছিল। আর কেউ তো ইচ্ছা করে ভুল প্রশ্ন দেয় না। ”।
অন্য এক পরীক্ষার্থী রিপন বলেন, "২০২৫ সালের অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু আইসিটিতে সবারই এফ গ্রেডে এসেছে। আমরা এখন কী করব বুঝতে পারছি না।" অন্যদিকে রূপন্তী নামে অপর এক শিক্ষার্থী বিষয়টির জটিলতা ব্যাখ্যা করে বলেন, "সবার জন্য আইসিটি সহজ সাবজেক্ট নয়। সিলেবাস অনুযায়ী পড়ালেখা করার পর অন্য সিলেবাসের প্রশ্ন এলে কীভাবে উত্তর দেব এবং কীভাবে পাস করা সম্ভব?" পরীক্ষার্থী ইয়াসিনও কেন্দ্র শিক্ষকদের অসতর্কতার বিষয়টি উল্লেখ করে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। পরীক্ষা শেষে বের হয়ে অন্য কক্ষের বন্ধুদের সাথে আলোচনার একপর্যায়ে বুঝতে পারি- বিগত (২০২৫) সালের প্রশ্নে আমরা পরীক্ষা দিয়েছি।
অভিভাবকদের মধ্যেও ঘটনাটি ঘিরে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অভিভাবক আশা অভিযোগ করেন, দায়িত্বে অসচেতন ব্যক্তিদের কারণে পরীক্ষার্থীদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর অপচয় হতে চলেছে। অন্য এক অভিভাবক রবিউল ইসলাম বলেন, পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীরা অকৃতকার্য হলেও উপশহর ডিগ্রি কলেজ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো দৃশ্যমান আইনি বা প্রশাসনিক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
উপশহর ডিগ্রি কলেজের আইসিটি বিভাগের শিক্ষিকা ইসমত আরা ভুল প্রশ্নের কারণে কিছু শিক্ষার্থী ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ৫ নভেম্বর বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এবং বোর্ডের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদেরও রেজাল্ট রিভিউর আবেদন করার জন্য বলা হয়েছে।
অপরদিকে উপশহর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান দাবি করেছেন, ঘটনার পর বোর্ড তাদের অব্যাহতির নির্দেশ দিলেও পরবর্তীতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা তার জানা নেই। তিনি অকৃতকার্যের সংখ্যা নিয়ে দ্বিধা তৈরি করে বলেন, ভুল প্রশ্ন পাওয়ার সংখ্যা ৩৮ নয়, বরং ২১ জন। এটি অনিচ্ছাকৃত একটি ভুল ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম হোসেন আলী সাফ জানিয়েছেন, বোর্ডে আইন বা নীতি অনুযায়ী কেন্দ্র সচিবদের অব্যাহতি দিয়ে যা যা করা সম্ভব ছিল তা করা হয়েছে; সুতরাং এতে বোর্ডের নিজস্ব কোনো গাফিলতি বা দায় নেই।