Eng
চট্টগ্রাম, জাতীয়, লিড নিউজ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১০ মাসে ৬৯ প্রাণহানি, প্রশ্ন নজরদারিতে

প্রকাশিত: , ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:২৮ অপরাহ্ণ




ক্রাইম এডিশন অনলাইন:

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে এ অংশে ৮৭টি দুর্ঘটনায় ৬৯ জন নিহত এবং ৯৫ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬২টি। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশের নজরদারি, চালকদের জবাবদিহি এবং মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হাইওয়ে পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের একই সময়ে ফেনী অংশে দুর্ঘটনায় ৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আহত হয়েছিলেন ৫১ জন। ওই সময় এসব ঘটনায় ৪৮টি মামলা হয়। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের একই সময়ে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৪৬ জন এবং আহত হন ৪৩ জন। পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই বছরের ব্যবধানে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
দুর্ঘটনায় হতাহতদের স্বজনদের অভিযোগ, অনেক ঘটনায় চালক পালিয়ে যাওয়ার পর গাড়ি জব্দ ও মামলা দায়েরের মধ্যেই পুলিশের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে দায়ীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়। একাধিক স্বজনের দাবি, দুর্ঘটনার ঘটনায় দায়ের করা অনেক মামলায় এখনো চালকদের গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মামলাভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম ব্যবহার বন্ধ
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যানবাহনের গতি পরিমাপের স্পিড গান এবং চালকদের মাদকাসক্তি শনাক্তে ডোপ টেস্টের সরঞ্জাম থাকলেও বর্তমানে এসব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন মহিপাল হাইওয়ে পুলিশের পরিদর্শক মো. নুরুল আফছার।
তিনি জানান, মহাসড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এ কারণে স্পিড গান ব্যবহার করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে ডোপ টেস্ট কার্যক্রমও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
নুরুল আফছারের ভাষ্য, দুর্ঘটনার জন্য শুধু একজনকে দায়ী করা যায় না। চালকদের অসতর্কতা, দ্রুতগতিতে যানবাহন চালানো, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং সড়ক পারাপারে নিয়ম না মানার মতো বিষয়গুলো দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার প্রবণতা বাড়ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে, হাইওয়ে পুলিশের দাবি, মহাসড়কে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। এআই ক্যামেরার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের শরীরে বডি ক্যামেরাও রয়েছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

দুই এলাকায় দুর্ঘটনার চিত্র
ফাজিলপুর হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কবির হোসেন জানান, তাঁদের আওতাধীন এলাকায় একই সময়ে ৩৬টি দুর্ঘটনায় ৩২ জন নিহত ও ৪০ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ২৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, নয়টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে এবং চারটি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে, মহিপাল হাইওয়ে পুলিশের আওতাধীন এলাকায় জানুয়ারি থেকে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ৫১টি দুর্ঘটনায় ৩৭ জন নিহত ও ৫৫ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৮টি বলে জানিয়েছেন পরিদর্শক মো. নুরুল আফছার।
প্রশিক্ষণ ও নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ফেনী জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান দারা মনে করেন, চালকদের পর্যাপ্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তাঁর মতে, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন এবং মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতিও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।

বিআরটিএ ফেনী সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) মো. আল ফয়সাল চালকদের প্রশিক্ষণ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল বন্ধেও অভিযান চালানোর উদ্যোগ রয়েছে।
তিনি আরও জানান, গত ১২ জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২১ জনের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং আহত দুই ব্যক্তির পরিবারকে চার লাখ টাকার অনুদানের চেক দেওয়া হয়েছে।
অজ্ঞাত আসামি, তদন্তে চ্যালেঞ্জ
দুর্ঘটনার পর চালক পালিয়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করতে হয় বলে জানিয়েছেন মহিপাল হাইওয়ে পুলিশের পরিদর্শক। এতে দায়ীদের শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দীন খাঁন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়। তবে এসব মামলার অধিকাংশ আসামি অজ্ঞাত থাকেন।
সড়কে প্রাণহানি কমাতে নিয়মিত নজরদারি, চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আইন প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত তদন্তের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুর্ঘটনার পর শুধু মামলা দায়ের নয়, দায়ীদের শনাক্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।