
ঠাকুরগাঁওয়ের পূর্ব আকচায় অবস্থিত ‘লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর’ যেন এক টুকরো বিশ্ব। ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) পরিচালিত এই বেসরকারি জাদুঘরটিতে এখন ১০টি ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটেছে। জাদুঘরটির বিশেষ এই লোকজ খেলনা গ্যালারিতে মালদ্বীপ, কাতার, তুরস্ক, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, কেনিয়া, আজারবাইজান, সেনেগাল, ভারত ও বাংলাদেশের পুতুলের এক বিশাল সমাহার প্রদর্শিত হচ্ছে।
প্রদর্শনীতে রাখা পুতুলগুলোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক, মাথার টুপি এবং নকশার ভিন্নতা দর্শনার্থীদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করছে। জাদুঘরের অ্যাকাউন্টেন্ট জীবন চন্দ্র রায় জানান, এই পুতুলগুলো শুধু খেলনা নয়, বরং সংশ্লিষ্ট দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক। এগুলোর সাজসজ্জা দেখলেই বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। ফলে এই গ্যালারি শুধু প্রদর্শনীর নয়, অতীতকে জানা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ।
গ্যালারির অন্য অংশে রয়েছে গ্রামবাংলার চিরায়ত জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। সেখানে নারী-পুরুষের দলবদ্ধ প্রতিকৃতিতে উঠে এসেছে অতীত বাংলার হাটবাজার ও মেলা সংস্কৃতির দৃশ্য। একসময় গ্রামীণ উঠান বা গাছের ছায়ায় বসে মানুষের যে আড্ডার আসর জমতো, তা এই জাদুঘরে মূর্ত হয়ে উঠেছে। জীবন চন্দ্র রায় উল্লেখ করেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির এই সময়ে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এমন সামাজিক দৃশ্যগুলো নতুন ও কৌতূহলপূর্ণ। শিক্ষার্থী ইসরাত ফারজানা ও মারিয়া জাহান জানায়, পুতুলগুলোর এই দলবদ্ধ বসার দৃশ্য দেখে তারা বুঝতে পারে, মোবাইল ফোনের আগের যুগে মানুষ কতটা ঘনিষ্ঠভাবে সময় কাটাতেন। জাদুঘর দেখতে আসা কচুবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলে, ‘এখানে বিভিন্ন দেশের পুতুল দেখে ভালো লেগেছে। বড়দের কাছে শুনেছি, আগে মানুষ অবসর সময়ে উঠানে বা বাড়ির সামনে একসঙ্গে বসে গল্প করত।’।
জাদুঘরটির লোকজ খেলনা গ্যালারিতে শুধু পুতুলই নয়, জায়গা পেয়েছে হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঠের গাড়ি, লাটিম ও মার্বেলের মতো খেলনা। দর্শনার্থী জাকির হোসেন তাঁর শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, একসময় সামান্য কয়েকটি মার্বেল বা লাটিম ঘিরেই বন্ধুদের মধ্যে দারুণ আনন্দঘন মুহূর্ত কাটতো। শিক্ষার্থী নির্ঝর আহমেদ ও সবুজ রানা জানায়, আধুনিক খেলনার ভিড়ে এসব পুরোনো দিনের খেলনা দেখে তারা বুঝতে পারছে তাদের পূর্বসূরিরা কীভাবে বিনোদন খুঁজতেন। আমাদের কাছে এখন অনেক ধরনের আধুনিক খেলনা আছে, কিন্তু আগের দিনে শিশুরা কীভাবে এসব সাধারণ খেলনা দিয়ে আনন্দ পেত, তা জানতে পারছি।’।
ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যাপক আবু বক্কর সিদ্দিক এই সংগ্রহশালাটিকে ইতিহাস ও সংস্কৃতির চমৎকার মেলবন্ধন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, একদিকে ১০ দেশের সংস্কৃতির পরিচয় মেলে, অন্যদিকে বাংলার গ্রামীণ স্মৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সংযোগ ঘটে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মনোতোষ কুমার দে বলেন, প্রতিটি পুতুল ভিন্ন দেশের সংস্কৃতির জানালা খুলে দেয়। আর গ্রামীণ লোকজ খেলনা দর্শনার্থীদের শৈশবের স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সব মিলিয়ে এই গ্যালারিটি কেবল একটি প্রদর্শনী নয়, বরং জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার এক অনন্য মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।




