
ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত অব্যাহত রাখা এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে কয়েক মাস ধরেই গভীর মতবিরোধ চলছে। বিষয়টি নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ওয়াশিংটন পোস্টের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ এই অস্থিরতার মূল কেন্দ্রে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও আসন্ন নির্বাচনের ওপর যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি।
প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, ইরান ইস্যুতে নেতানিয়াহুর নেওয়া পদক্ষেপগুলো ভুল এবং তিনি ট্রাম্পকে সামরিক অভিযান বন্ধ করে তেহরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার পরামর্শ দিয়েছেন। ভ্যান্সের মতে, ইরান যুদ্ধ মার্কিন ভোটারদের কাছে অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং এটিই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের একটি বড় কারণ। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে তিনি স্পষ্টভাবেই মন্তব্য করেছেন যে, এই যুদ্ধের কারণেই তারা নির্বাচনে হেরেছেন। তার মতে, ইরান যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পররাষ্ট্রনীতিতে অসন্তোষের কারণে ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে সমর্থন করা অনেক ভোটার এবার দলটির পাশ থেকে সরে গেছেন।
প্রশাসনের ভেতরে নীতির এই লড়াইয়ে বিভক্তি স্পষ্ট। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও, ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছেন। গত সেপ্টেম্বরে হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে শীর্ষ পর্যায়ের এক বৈঠকে যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। সে সময় আশঙ্কা করা হয়, নির্বাচনের আগে সামরিক হামলার বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে তা রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এরপর সীমিত পরিসরে ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চললেও বিষয়টি নিয়ে জনসমক্ষে খুব একটা প্রচারণা চালায়নি মার্কিন প্রশাসন।
নেতানিয়াহু মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ইরানে বড় ধরনের নতুন হামলা চালাতে ট্রাম্পের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন বলে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে ট্রাম্প নির্বাচনের আগে যুদ্ধ নতুন করে শুরু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধিতে এখনো বিমানবাহী রণতরি ও মেরিন সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে। ট্রাম্প নিজেও যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্বাচনের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি এখনো ইরানকে পরমাণু শক্তি অর্জনে বাধা দিতে প্রয়োজনে সামরিক অভিযানের পথ খোলা রাখার পক্ষেই রয়েছেন।
বর্তমানে ট্রাম্পের সামনে তিনটি বড় কৌশলগত বিকল্প রয়েছে—পুরোদমে সামরিক অভিযান শুরু করা, তেহরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো, অথবা নৌ অবরোধ ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ বজায় রাখা। কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার খসড়া তৈরির একটি উদ্যোগ চলমান থাকলেও প্রশাসনের একাংশ অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অনড়। সামরিক কৌশল, কূটনৈতিক সমাধান ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল সমীকরণে ট্রাম্প এখন এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে রয়েছেন।




