
ক্রাইম এডিশন, ডেস্ক রিপোর্ট:
লালমনিরহাটের বুড়িমারীগামী একটি যাত্রীবাহী বাসে ভোরে ঘটেছে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। সোমবার (৩ নভেম্বর ২০২৫) ভোর ৬টার দিকে ঢাকা থেকে ছাড়ানো “পিংকি পরিবহন” নামের একটি বাসে তিনজন পেশাদার চোর হাতেনাতে ধরা পড়েছে। জানা গেছে, তারা সাপ্টিবাড়ী এলাকা থেকে বাসে ওঠে যাত্রা শুরু করে, এরপর এক পর্যায়ে এক মহিলা যাত্রীর কাছ থেকে টাকা ও মোবাইল ফোন চুরির চেষ্টা চালায়।
চুরি করার মুহূর্তেই বিষয়টি টের পেয়ে যান পাশের আসনের কয়েকজন যাত্রী। তাৎক্ষণিকভাবে তারা তিনজনকে ধরে ফেলে। এ সময় বাসের ভেতর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যাত্রীরা তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা চুরির ঘটনা স্বীকারও করে নেয় বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা বারবার ঘটছে। অনেক যাত্রী বলেন, দীর্ঘ যাত্রাপথে বাস বা ট্রেনে ঘুমিয়ে পড়া বা অসচেতন থাকার সুযোগে এই ধরনের পকেটমার বা চোরচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই কেউ কেউ চোরদের ধরে কিছুটা ‘উত্তম-মধ্যম’ দেন, পরে ভুল্ল্যারহাট এলাকায় বাস থামিয়ে ভুক্তভোগী মহিলার এলাকার স্থানীয় লোকজনের হাতে তাদের তুলে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী ওই নারী জানান, তিনি ঢাকা থেকে বুড়িমারীগামী বাসে একা ভ্রমণ করছিলেন। কিছুক্ষণ পরেই লক্ষ্য করেন, ব্যাগের চেইন খোলা ও তার ভেতর থেকে মোবাইল ও কিছু নগদ টাকা উধাও। চারপাশে তাকিয়ে সন্দেহজনকভাবে তিনজনকে নড়াচড়া করতে দেখে তিনি চিৎকার করেন। তাতেই অন্য যাত্রীরা এগিয়ে এসে তিনজনকে ধরে ফেলেন।
বাসের চালক ও হেলপার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, যাত্রীরা সময়মতো চোরদের ধরে ফেলার কারণে বড় ক্ষতি এড়ানো গেছে। তারা বলেন, “আজকাল প্রায়ই দেখা যায়, কিছু চোরচক্র যাত্রীবেশে বাসে উঠে হাতের কাছে যা পায় তা নিয়ে নেয়। আমাদের চেষ্টা থাকে, যাত্রীদের নিরাপদ রাখার, তবে এমন ঘটনা রোধে সবার সচেতন হওয়া দরকার।”
এ ঘটনার পর যাত্রীরা পুলিশে যোগাযোগের কথা ভাবলেও ভুক্তভোগী মহিলার অনুরোধে স্থানীয় এলাকাবাসীর হাতে চোরদের হস্তান্তর করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ভুল্ল্যারহাট বাজার এলাকায় পৌঁছানোর পর স্থানীয়রা চোরদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারা এলাকার বাইরের বাসিন্দা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ের এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। অনেকে বলছেন, গণপরিবহনে যাত্রার সময় সবাইকে নিজের ব্যাগ, মোবাইল ফোন, টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্রের প্রতি সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে ভোরবেলা বা রাতের যাত্রায় ঘুমিয়ে পড়লে এমন ঘটনার আশঙ্কা অনেক বেশি।
সচেতন মহল মনে করছেন, দীর্ঘ ভ্রমণে গাড়ির ভেতরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং যাত্রী উঠানামার সময় যথাযথ তদারকি থাকলে এই ধরনের অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে পরিবহন মালিক ও যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য প্রচারণা চালানোও জরুরি।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আগেও কয়েকবার এমন ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু অনেক সময় চোরেরা ধরা না পড়ে পালিয়ে যায়। এবার তিনজনকে হাতেনাতে ধরেছে যাত্রীরা—এটা একটা দৃষ্টান্ত। যদি সবাই সচেতন থাকে, তবে ভবিষ্যতে চোরেরা এই ধরনের কাজ করার সাহস পাবে না।”
ভুক্তভোগী নারীও যাত্রীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “যদি সবাই এমনভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে অপরাধীরা ধরা পড়বে সহজেই। আমার মোবাইল ও টাকা ফেরত পেয়েছি, এজন্য আমি সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানাই।”
অন্যদিকে পুলিশের এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, “এমন ঘটনায় যাত্রীদের সহযোগিতাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। কেউ যদি চুরি বা প্রতারণার শিকার হন, সঙ্গে সঙ্গে থানায় জানানোর অনুরোধ করছি। আমরা তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।”
সবশেষে, বাস-ট্রেনে বা লঞ্চে যাত্রার সময় প্রত্যেক যাত্রীকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। কারণ অজান্তে কয়েক সেকেন্ডের অসাবধানতাই বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।