
ক্রাইম এডিশন, অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশে গত বছরের জুলাই-অগাস্ট মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলায় আনা পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে দুইটিতে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। বহু মাস ধরে চলা তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও প্রমাণ উপস্থাপনের পরই এ রায় প্রদান করা হয়।
ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায়ের ঘোষণা দেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। রায় ঘোষণার সময় আদালতকক্ষে আইনজীবী, গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং বিভিন্ন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
শুনানির বিভিন্ন সময়ে ট্রাইব্যুনালে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেত্রবিশেষ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, গুলি করে হত্যার দৃশ্য, ভুক্তভোগীদের বর্ণনা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া সেই সময় শেখ হাসিনার বিভিন্ন ফোনালাপ বাজিয়ে শোনানো হয়, যাতে আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা ছিল বলে দাবি করা হয় আদালতে।
মামলায় আরও দুইজন আসামি ছিলেন—সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। ট্রাইব্যুনাল একটি অভিযোগে আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। অন্যদিকে রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান বর্তমানে পলাতক এবং ভারতের কোথাও অবস্থান করছেন বলে বিচারপত্রে উল্লেখ করা হয়।
এই মামলায় মোট ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। চলতি বছরের ৩ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে ৮ অক্টোবর শেষ হয়। এরপর উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামসহ আইনজীবীরা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আসামিপক্ষে প্রশ্ন ও জেরা পরিচালনা করেন।
মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ছিল ৮ হাজার ৭০০ পৃষ্ঠারও বেশি। উসকানি, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, নির্যাতন, নির্দিষ্ট এলাকায় হত্যাকাণ্ড এবং লাশ পোড়ানোর অভিযোগগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিটি অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত ছিল দালিলিক প্রমাণ, জব্দ করা নথি এবং নিহতদের বিস্তারিত তালিকা।
রায় ঘোষণার পর আদালতের বাইরে উপস্থিত কয়েকজন নিহতের স্বজন সিদ্ধান্তটিকে স্বস্তিদায়ক বলে মন্তব্য করেন। তারা জানান, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তারা কিছুটা ন্যায়বিচারের স্বাদ পেলেন। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী আসামিপক্ষ চাইলে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন।