
ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
ভোরের আলো ফোটার আগেই জমে ওঠে মাছের রেণু-পোনার বাজার। যশোর শহরের চাঁচড়া বাবলাতলা সড়কের দুই পাশে প্রতিদিন বসেন শত শত বিক্রেতা। বড় হাঁড়ি ও পাত্রে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা নিয়ে তারা অপেক্ষা করেন ক্রেতাদের জন্য। কেউ পোনার মান যাচাই করেন, কেউ দরদাম করেন, আবার কেউ কেনা পোনা গুনে অক্সিজেনভর্তি ব্যাগে তুলে দেন।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যস্ততায় সরগরম হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। তবে এই বাজারের ব্যস্ততা দীর্ঘ সময় থাকে না। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যেই মূল বেচাকেনা অনেকটা শেষ হয়ে যায়। তাদের দাবি, প্রতিদিন এখানে প্রায় ২ কোটি টাকার রেণু-পোনা কেনাবেচা হয়।
যশোরের চাঁচড়া ও আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক ছোট-বড় মাছের হ্যাচারি। এসব হ্যাচারিতে রুই, কাতলা, মৃগেল, কই, শিং, টেংরা, তেলাপিয়া ও অন্যান্য প্রজাতির মাছের রেণু ও পোনা উৎপাদন করা হয়। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর এসব পোনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়।
বর্তমানে চাঁচড়া বাবলাতলার বাজারে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ জন ব্যবসায়ী সক্রিয় রয়েছেন বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, প্রতিদিন ট্রাক, পিকআপ, বাস এবং ট্রেনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পোনা পাঠানো হয়। ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বরিশাল, ভোলা, ফরিদপুর ও খুলনাসহ বিভিন্ন জেলার মাছচাষিরা এখান থেকে পোনা সংগ্রহ করেন।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিং মাছের পোনা প্রতি হাজার ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। টেংরা মাছের পোনা প্রতিটি প্রায় দেড় টাকা, তারা বাইন তিন টাকা, স্বরপুঁটি প্রতি হাজার ১ হাজার ৫০০ টাকা, চিতল প্রতিটি ৬০ টাকা এবং থাই পাঙ্গাস প্রতিটি তিন টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মিনারকার্প প্রতি কেজি ৮০০ টাকা এবং পাবদা প্রতি হাজার ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
কার্পজাতীয় মাছের পোনার দামও প্রজাতিভেদে ভিন্ন। রুই প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, মৃগেল ২২০ থেকে ২৮০ টাকা, কাতলা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং সিলভার কার্প ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বৃষ্টিপাত বাড়ায় মাছচাষিদের মধ্যে পোনা কেনার আগ্রহ বেড়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। এর ফলে বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতিও বেড়েছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে যশোরের হ্যাচারিগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মোট ৪৭ হাজার ১৫৭ কেজি রেণু উৎপাদন হয়েছে। জেলার অভ্যন্তরীণ চাহিদা ছিল ১৯ হাজার ৩১৭ কেজি। চাহিদা পূরণের পর ২৭ হাজার ৭৩৪ কেজি রেণু-পোনা অন্য জেলায় সরবরাহ করা হয়েছে।
হ্যাচারি ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, যশোরে বাণিজ্যিকভাবে মাছের রেণু উৎপাদন শুরু হয় আশির দশকে। সময়ের সঙ্গে এ খাতের পরিধি বেড়েছে। বর্তমানে হ্যাচারি, পোনা বিক্রি, পরিবহনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ হাজার মানুষ যুক্ত রয়েছেন।
এ খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। চাঁচড়া ডালমিল এলাকার একটি হ্যাচারিতে সোলার প্যানেল ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খরচ কমানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তা আমিরুল হক। তার দাবি, গত অর্থবছরে ওই হ্যাচারিতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা মূল্যের ১০ হাজার কেজি রেণু উৎপাদন হয়েছে। সোলার প্যানেল ব্যবহারের ফলে বিদ্যুৎ খরচ প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি পানি পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যশোরে পোনা বিক্রির জন্য আধুনিক একটি কেন্দ্রও নির্মাণ করা হয়েছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, চাঁচড়া এলাকায় ৮০ শতক জমির ওপর ১৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রটি তৈরি করা হয়েছে। সেখানে পোনা উৎপাদন ও কেনাবেচার পাশাপাশি পানি সরবরাহ, অক্সিজেন ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা এখনো সেখানে বরাদ্দ নিতে আগ্রহ দেখাননি। ফলে অনেক বিক্রেতা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সড়কের পাশেই ব্যবসা করছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, যশোরের পোনার মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর চাহিদা রয়েছে। তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা এবং পরিবহন জটিলতা এ খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা সমাধানে সহায়তা পাওয়া গেলে রেণু-পোনা উৎপাদন ও বিপণনের পরিধি আরও বাড়তে পারে বলে তাদের প্রত্যাশা।




