
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং স্বচ্ছতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সে সময় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, সরকারের উপদেষ্টারা তাদের আয় ও সম্পদের বিবরণ জনসম্মুখে প্রকাশ করবেন। কিন্তু প্রায় দেড় বছর পার হয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রশ্ন ও বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অভিযোগ উঠেছে, উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত আয় ও সম্পদের হিসাব এখনও প্রকাশ না হওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় রাষ্ট্রীয় সুযোগ–সুবিধা কীভাবে এবং কারা ব্যবহার করেছেন, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য না থাকায় বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, শুধু উপদেষ্টাদের নিজের সম্পদের হিসাবই নয়, দায়িত্ব পালনের সময় তাদের পরিবারের সদস্য, নিকটাত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ বা সুবিধা পেয়েছেন কি না—সে বিষয়েও পরিষ্কার ব্যাখ্যা আসা প্রয়োজন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত ব্যক্তিরা বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করেছেন কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগ জনগণ এখনও পায়নি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জবাবদিহিতার জায়গায় কেবল ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব নয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুবিধা ব্যবহারের স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো উপদেষ্টা বা তাদের পরিবারের সদস্য যদি সরকারি অর্থ, যানবাহন, বাসভবন, ভ্রমণ সুবিধা বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে থাকেন, তবে তার বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ হওয়া উচিত—এমনটাই মত দিয়েছেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীনদের আত্মীয়স্বজনদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে। সেই অভিজ্ঞতার কারণে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রেও জনগণ বাড়তি সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। অভিযোগ উঠেছে, উপদেষ্টাদের পরিবারের কেউ কোথায়, কোন খাতে, কীভাবে সরকারি সুবিধা ব্যবহার করেছেন—তার কোনো প্রকাশ্য তথ্য না থাকায় সন্দেহের জায়গা তৈরি হচ্ছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, উপদেষ্টাদের আয় ও সম্পদের বিবরণ প্রধান উপদেষ্টার মাধ্যমে প্রকাশ করার বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে সেই তথ্য এখনো জনসম্মুখে আসেনি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই তথ্য প্রকাশে বিলম্বের কারণ কী এবং কেন এখনো স্বচ্ছভাবে সবকিছু সামনে আনা হয়নি।
এ বিষয়ে সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা দাবি করেছেন, তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন। তবে কবে এবং কীভাবে সেগুলো প্রকাশ করা হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট সময়সূচি জানানো হয়নি।
আরও অভিযোগ উঠেছে, ভবিষ্যতে যদি কোনো উপদেষ্টা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরকারি অর্থ ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ হিসাব না দিয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে সেটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করবে। সরকারি তহবিল কোথায়, কোন খাতে এবং কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে—তার স্পষ্ট হিসাব না থাকলে এমন ভ্রমণ বা সুবিধা গ্রহণ নিয়ে বিতর্ক বাড়বে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও যদি উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত সম্পদ, পাশাপাশি দায়িত্বকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা ব্যবহারের একটি পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হয়, তাহলে আস্থার সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। অন্যথায়, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও স্বচ্ছতার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার যাত্রা শুরু করেছিল, তা প্রশ্নের মুখেই থেকে যাবে বলে মনে করছেন তারা।