
ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া এবং বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হলে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আনতে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যেখানে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ দিন সময় লাগত, বিকল্প ও দীর্ঘ নৌপথ ব্যবহার করতে হলে সেই সময় ৫০ দিনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয়, জাহাজভাড়া ও বিমা খরচ বাড়ার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে জ্বালানি হাতে পাওয়ার বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব নৌপথ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এই পথগুলোতে কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়তে পারে। এর প্রভাব আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামও ইতোমধ্যে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ৬১ ডলারে উঠেছে বলে জানা গেছে। এক মাস আগে এই দাম ছিল প্রায় ৮৭ দশমিক ০৭ ডলার।
বাংলাদেশে এলএনজি, জ্বালানি তেল, এলপিজি ও সারসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথগুলোর গুরুত্ব রয়েছে। কোনো একটি রুট ব্যবহার করা সম্ভব না হলে বিকল্প পথে জাহাজ পরিচালনা করতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত দূরত্ব অতিক্রম করার কারণে জ্বালানি খরচ ও ফ্রেইট বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, সৌদি আরব থেকে জ্বালানি আনতে বিকল্প পথে গেলে সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এতে বাড়তি পরিবহন ব্যয় এবং দীর্ঘ সময় পণ্য পরিবহনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তিনি জানান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ নৌপথে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বিমা ব্যয়ও বাড়তে পারে। পাশাপাশি সব ধরনের ট্যাংকার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে আগ্রহী নাও হতে পারে। ফলে প্রয়োজনের সময়ে পর্যাপ্ত জাহাজ পাওয়া নিয়েও সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। তিনি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। বিশেষ করে ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি আমদানির যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দিয়েছেন।
ইতোমধ্যে বিকল্প রুট ব্যবহার করে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে একটি জাহাজে প্রায় এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল বাংলাদেশে এসেছে বলে জানা গেছে। জাহাজটি আফ্রিকা ঘুরে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় নিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি দীর্ঘ নৌপথের প্রভাব দেশের রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যেও পড়তে পারে। বাব আল-মান্দেবের মাধ্যমে ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডায় পণ্য পরিবহনে কোনো বাধা তৈরি হলে বিকল্প পথে যেতে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আগামী মাসগুলোতে নতুন চালান আনার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা পর্যবেক্ষণ করে আমদানির রুট ও উৎস নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দ্রুত শেষ না হলে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন হতে পারে। বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।




