
ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
দেশের পোলট্রি খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বিক্রয়মূল্যের অসামঞ্জস্যে চাপে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা। খামারে উৎপাদিত ব্রয়লার মুরগি ও ডিম বিক্রি করে প্রত্যাশিত আয় না পাওয়ায় অনেকেরই ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, খামার পর্যায় থেকে ভোক্তার বাজার পর্যন্ত পণ্য পৌঁছাতে দামের বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। এতে একদিকে উৎপাদকরা লোকসানের ঝুঁকিতে পড়ছেন, অন্যদিকে ভোক্তাদেরও কিনতে হচ্ছে তুলনামূলক বেশি দামে।
২৪ অক্টোবর প্রকাশিত বাজার পরিস্থিতির তথ্যানুযায়ী, ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকায়। বিপরীতে, প্রান্তিক খামারি শাফিউর রহমান চলতি সপ্তাহে মুরগি বিক্রি করেছেন কেজিপ্রতি ১৩৪ টাকায়। অর্থাৎ খামার ও খুচরা বাজারের দামে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৫৬ টাকা। তবে এই ব্যবধানের পুরোটা ব্যবসায়ীদের মুনাফা নয়। পরিবহন, শ্রম, সংরক্ষণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য খরচও এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।
খামারি শাফিউর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, পোলট্রি খাদ্য ও ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর দাবি, গত দুই মাসে ব্রয়লার মুরগির খাবারের বস্তাপ্রতি দাম ২২৫ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে ৫০ কেজির একটি বস্তা কিনতে খরচ হচ্ছে ৩ হাজার ৭৮৫ টাকা। পাশাপাশি ওষুধের ব্যয়ও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
নিজের খামারের আর্থিক ক্ষতির বিবরণ দিয়ে শাফিউর রহমান জানান, তিনি এক চালানে ১ হাজার ২০০টি মুরগি তুলেছিলেন। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার মুরগি বিক্রি করেছেন। ওই চালানে তাঁর প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বাকি মুরগির কিছু মারা গেছে এবং প্রায় ৭০ কেজি মুরগি তখনো খামারে ছিল।
উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কম থাকলে খামারিদের হাতে নতুন বিনিয়োগের অর্থ কমে আসে। ফলে পরবর্তী চালানে বাচ্চা কেনা, খাদ্য সংগ্রহ ও খামারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে সীমিত পুঁজি নিয়ে পরিচালিত খামারগুলোতে এ ধরনের আর্থিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন অব্যাহত রাখার সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ডিমের বাজারেও দামের ব্যবধান
ব্রয়লার মুরগির পাশাপাশি ডিম উৎপাদনকারী খামারিরাও বাড়তি ব্যয়ের মুখে রয়েছেন। লেয়ার খামারি আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি প্রতি পিস ডিম ৮ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি করেছেন। সে হিসাবে খামার পর্যায়ে প্রতি ডজন ডিমের দাম দাঁড়ায় ১০২ টাকা।
অন্যদিকে, ২১ অক্টোবর ঢাকার বাজারে প্রতি ডজন লাল ফার্মের ডিম বিক্রি হয়েছে ১৫৫ টাকায়। এতে খামার ও খুচরা বাজারের মধ্যে প্রতি ডজনে ৫৩ টাকার ব্যবধান দেখা যায়। আরিফুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, মুরগির খাবারের বস্তাপ্রতি দাম ৩২৫ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে এক বস্তা খাবারের দাম ২ হাজার ৯০০ টাকার বেশি। ডিম বিক্রি করে মূলত খরচ উঠে আসছে, উল্লেখযোগ্য লাভ থাকছে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সরবরাহের ওঠানামায় বদলাচ্ছে মুরগির দাম
ঢাকার একজন মুরগি ব্যবসায়ী আফজালের বক্তব্য অনুযায়ী, কাপ্তান বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর মুরগির দামের পরিবর্তন অনেকটাই নির্ভর করে। সরবরাহ বেশি থাকলে দাম কমে এবং সরবরাহ কমলে দাম বাড়তে পারে। তাঁর ভাষ্য, একই বাজারে রাত ও সকালের বিক্রয়মূল্যেও পার্থক্য দেখা যায়।
বাজারের এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়িক খরচের প্রভাব আলাদাভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। খামারি ও ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় উৎপাদন পর্যায়ের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং বাজারে যৌক্তিক মূল্য ব্যবধান বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে খাদ্য ও ওষুধের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে পণ্য সরবরাহের পরিস্থিতি খামারিদের আয় ও ভোক্তাদের ব্যয়ের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।




