
অনলাইন ডেস্ক:
ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের একটি ত্রাণকেন্দ্রে রাশিয়ার জোড়া বিমান হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন এবং আরো বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সোমবার এ তথ্য নিশ্চিত করে হামলাটিকে একটি জঘন্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ভয়াবহ এই প্রাণহানির ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন কূটনৈতিক আলোচনার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন দফার এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু রাশিয়া মানুষ হত্যা অব্যাহত রেখেছে।
ত্রাণকেন্দ্রে দুই দফায় হামলা ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের কোমিশুভাখা গ্রামের একটি স্কুলে এই ত্রাণকেন্দ্রটি পরিচালিত হচ্ছিল। গ্রামটি সম্মুখযুদ্ধের অতি কাছাকাছি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় স্বাভাবিক ক্লাস বন্ধ রাখা হয়েছিল, তবে ভবনটি স্থানীয়দের জন্য একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্রতি সপ্তাহের সোমবার সেখানে সংঘাতপীড়িত বাসিন্দাদের মধ্যে মানবিক সহায়তার প্যাকেট বিতরণ করা হতো এবং ঘটনার দিনও স্থানীয়রা সাহায্য নিতে জড়ো হয়েছিলেন।
জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, রুশ বাহিনী ভালোভাবেই জানত যে প্রতি সোমবারে সেখানে মানুষ সহায়তা নিতে সমবেত হয়। তা সত্ত্বেও প্রথম দফায় হামলা চালানোর পর মানুষ যখন উদ্ধারকাজে ও আশ্রয়কেন্দ্রে মনোযোগ দেয়, ঠিক তখন দ্বিতীয় দফায় আবার বোমা বর্ষণ করা হয়। ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে উদ্ধারকারী দলের ২ জন সদস্য এবং ৪ জন পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যেও ২ জন উদ্ধারকর্মী রয়েছেন। জাপোরিঝঝিয়া সিটি কাউন্সিলের সচিব রেজিনা খারচেঙ্কো জানিয়েছেন, হামলার পর অন্তত ২৭ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না তা দেখতে উদ্ধার অভিযান চলছে। এরপর আশ্রয়কেন্দ্রটিকে লক্ষ্য করে দ্বিতীয় দফায় আরো কয়েকটি বোমা ফেলা হয়।
আবুধাবিতে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ও মার্কিন মধ্যস্থতা
এই প্রাণঘাতী হামলার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু হচ্ছে। আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিরা মুখোমুখি আলোচনায় বসবেন। এ বৈঠকে যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা চুক্তি, সংঘাত প্রশমন, মানবিক পদক্ষেপ এবং সামগ্রিকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি টানার নানা উপায় নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এ হামলার বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ইউক্রেন এ ধরনের উদ্যোগের প্রস্তাবও দিয়েছিল।
এর আগে গত ২১ অক্টোবর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে মার্কিন দূত উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নিতে সম্মতি জানান। যুদ্ধের পঞ্চম বছরে প্রবেশের পটভূমিতে এবং শীতের মরশুম শুরুর আগেই সংঘাত নিরসনে একটি সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি আনতে চাইছেন মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সর্বশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও পরে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও ইরানের নতুন সংঘাতের কারণে সেই প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছিল।
নতুন আগ্রাসনের আশঙ্কা ও আন্তর্জাতিক স্তরে আহ্বান
জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনের জ্বালানি খাত ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর রাশিয়া আবারও বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে পুরো বিশ্বের দৃষ্টি থাকার সুযোগ নিয়ে মস্কো এ সুযোগ নিতে চাইছে। এর ফলে ইউক্রেনের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সংকট আড়ালে পড়ে যেতে পারে বলে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সব বিকল্প পথ বন্ধ করতে রাশিয়ার ওপর তীব্র আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। জেলেনস্কি বলেছেন, এই হামলা আবারও প্রমাণ করে যে রাশিয়া উত্তেজনা কমাতে বা প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। তার অভিযোগ, গত সপ্তাহে রাশিয়ার দখলে থাকা দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ওলেশকিতে একটি মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, মস্কো তা কাজে লাগায়নি। অনলাইনে প্রকাশিত ছবিতে হামলার স্থানে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।
এদিকে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা সোমবারের এই রক্তক্ষয়ী হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে রাশিয়াকে পুনর্বাসনের বিরোধিতা করেছেন। ক্রীড়া সালিশি আদালত (সিএএস) সম্প্রতি আইস হকি প্রতিযোগিতায় রাশিয়াকে ফেরানোর নির্দেশ দেওয়ার পর সিবিহা বলেন, রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানজনক অবস্থান দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং দেশটির অপকর্মের জন্য একঘরে করে রাখা এবং কঠোর পরিণতি নিশ্চিত করা উচিত।
অন্যান্য অঞ্চলে ড্রোন হামলা ও রাশিয়ার পাল্টা দাবি
সোমবার ইউক্রেনের অন্যান্য এলাকাতেও ব্যাপক রুশ ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। জরুরি সেবা বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলে ড্রোন হামলায় ১২ জন আহত হয়েছেন এবং সেখানকার একটি হিমাগার, বেশ কিছু গ্রিনহাউস ও আবাসিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া কৃষ্ণসাগরের কৌশলগত বন্দরনগরী ওদেসায় একটি গুদামে রুশ হামলায় ৫ জন আহত হন।
অন্যপ্রান্তে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে যে তারা রাতভর অভিযান চালিয়ে ইউক্রেনের মোট ২১২টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। রাশিয়ার সামারা অঞ্চলের গভর্নর ভ্যাচেস্লাভ ফেদোরিশচেভ জানিয়েছেন, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি আকাশপথে হামলা সফলভাবে প্রতিহত করেছে, তবে এর চেয়ে বেশি বিস্তারিত বিবরণ তিনি দেননি।




