
ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগমুহূর্তে দেশজুড়ে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও ইসলামবিদ্বেষী রাজনীতির প্রভাব নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন তাদের নিরাপত্তা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিও এবারের নির্বাচনে টেক্সাসের কোথাও কোনো মুসলিম প্রার্থী নেই, তবুও স্থানীয় মুসলিম ভোটাররা রাজনৈতিক নেতাদের এই বিদ্বেষমূলক আচরণের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ ও অবস্থান স্পষ্ট করতে চাইছেন। বিশেষ করে মুসলিম প্রার্থীদের ঘিরে রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণায় বিদ্বেষের বিষয়টি সামনে এসেছে। দল-মত নির্বিশেষে মুসলিম ভোটারদের অনেকেই আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, তারা রাজনৈতিক নেতাদের কাছে একটি বার্তা দিতে চান—মুসলিমদের যেন কোনো দলের রাজনৈতিক স্বার্থে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা না হয়। তবে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত এই অঙ্গরাজ্যে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও নীতিগত পদক্ষেপ যেভাবে বেড়েছে, তা তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এটি বন্ধ করতে আমাদের এখনই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কখনো কেউ সরকারে মুসলিম আইন চাপিয়ে দেয়নি।’। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর টেক্সাসে মুসলিমদের জন্য বিশেষ আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং স্বেচ্ছায় ইসলামি সালিশ পরিচালনাকারী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম। খ্রিষ্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও এ ধরনের স্বেচ্ছামূলক সালিশব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, মুসলিমদের জনজীবনে অংশগ্রহণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততাকে ইসলামি আইনের বিস্তারের হুমকি হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
আইনজীবী সামির নাজজাম জানান, রাজনীতিতে মুসলিমবিদ্বেষের বিষবাষ্প তিনি নিজের সন্তানদের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন। গত ৩ নভেম্বর ভোটের কয়েক দিন আগে হিউস্টনের একটি ইসলামিক সেন্টারে আয়োজিত ‘ফল ফেস্ট’ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় ৪৫ বছর বয়সি এই আইনজীবী বলেন, প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের পছন্দমতো মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারলেও শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রচারণার কারণে স্কুলে শিশুরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতি শুধু জাতীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের মতে, রাজনীতিতে মুসলিমদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার প্রভাব পড়ছে পরিবার, সন্তান এবং দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থন করে না সংগঠনটি। সম্প্রতি হিউস্টনে বসবাস শুরু করা ৩৩ বছর বয়সি চিকিৎসক সারাহ দাব্বাস বলেন, ‘বাস্তব জীবনে সবাইকে যেভাবে দেখানো হচ্ছে, মানুষ আসলে ততটা বিদ্বেষী নয়।
টেক্সাসের মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশেরও কম মুসলিম হলেও এবার তারা ভোটার উপস্থিতি বাড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের শক্তির জানান দিতে চাইছেন। গত দুই বছরে এমনও ভেবেছি, যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েই চলে যাব।’। আমাকে ইতোমধ্যে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি চাই না আমার সন্তানকেও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হোক।’। টেক্সাস ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক ঘটনায় দলটির বিদায়ী চেয়ারম্যান আব্রাহাম জর্জ দুই মুসলিম প্রতিনিধিকে দল ছেড়ে চলে যেতে বলেন।
হিউস্টনের ৩০টির বেশি মসজিদের তত্ত্বাবধানকারী ‘ইসলামিক সোসাইটি অব গ্রেটার হিউস্টন’-এর সভাপতি এমরান গাজী জানিয়েছেন, তারা মুসলিমদের কোণঠাসা করার চেষ্টা রুখে দিতে ব্যাপকভাবে ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
জুমার নামাজের সময়ও ধর্মীয় নেতারা মুসল্লিদের বিবেক অনুযায়ী ভোট দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন, যাতে রাজনীতিবিদরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থকে বিবেচনায় রাখেন।
ইসলামবিদ্বেষের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসক মারিয়াম আহমেদের মতো অনেকে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অসহনীয়’ বলে বর্ণনা করেছেন। ৪২ বছর বয়সি এই চিকিৎসক জানান, সন্তানকে যেন সন্ত্রাসী হিসেবে দেখা না হয়, সেই ভীতি তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে। টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এবং সিনেটর টেড ক্রুজের মতো নেতারা নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার ‘শরিয়াহ আইন’ প্রসঙ্গটি তুলে আনছেন। তারা একে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের মতো নেতারা এর অন্যতম উদাহরণ। সেখান থেকে পাওয়া ধারণার কারণে শিশুরাও একে অপরকে নানা অপ্রীতিকর কথা বলে।’। ৪২ বছর বয়সি চিকিৎসক মারিয়াম আহমেদ বলেন, ‘সত্যি বলতে, পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। গত মাসে ডালাসে অনুষ্ঠিত রিপাবলিকান মিডটার্ম কনভেনশনে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট বলেন, ‘আমরা ওয়াশিংটন ডিসির জন্য অপেক্ষা করছি না। টেক্সাসে শরিয়াহ আইন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করব।’। এতে শরিয়াহ আইনের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি শাস্তি, সরকারি চাকরি, সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে কাজের অযোগ্য ঘোষণা, নাগরিকত্ব বাতিল এবং দেশ থেকে বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়। মানবাধিকারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শরিয়াহ আইন নিয়ে রাজনীতিবিদদের এমন প্রচারণা যেমন বিস্ময়কর, তেমনি উদ্বেগজনকও।
গত জুনে টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টি ‘ডোন্ট শরিয়াহ মাই টেক্সাস’ নামে একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি গ্রহণ করে। এছাড়া আইনসভার ১৫০ সদস্যের মধ্যে ৩৮ জন ‘শরিয়াহ-ফ্রি টেক্সাস ককাস’ নামে একটি জোটে যুক্ত হয়েছেন। কংগ্রেসে রিপাবলিকান চিপ রয় ও কিথ সেলফের নেতৃত্বে অনুরূপ জোটের সদস্যসংখ্যা এখন ৬৮ জনে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টেক্সাস বা যুক্তরাষ্ট্রে কোথাও শরিয়াহ আইন চালু না থাকলেও রাজনীতিবিদরা কেবল রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এই বিষয়টিকে ইস্যু বানাচ্ছেন।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দ্য ব্রিজ ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুসলিমদের সাধারণ সামাজিক কর্মকাণ্ড ও তাদের অস্তিত্বকেই টেক্সাসের রাজনীতিবিদরা হুমকির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন। এমনকি রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে যুক্ত অনেক মুসলিমও এই বৈষম্য থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। সম্মেলনে একাধিকবার মুসলিমদের পরিচয় নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে, যা দলীয় সদস্যদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ইসলামবিদ্বেষ পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, টেক্সাসের রাজনীতিবিদরা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বড় করে দেখাচ্ছেন।
এদিকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ‘কেয়ার টেক্সাস’-এর মতো সংগঠনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছেন।
এর জবাবে কেয়ার টেক্সাস গভর্নর ও অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
স্থানীয় সংগঠক সানিয়া রহিম জানান, মুসলিম সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যের কারণে সবাইকে এক ছাতার নিচে আনা চ্যালেঞ্জিং হলেও তারা ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তনের আশা ছাড়ছেন না।
রক্ষণশীল অনেক মুসলিমও এবার তাদের পরিচিত দলের প্রার্থীদের ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।




