
ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে তাঁর নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা সীমিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সম্ভাব্য পরিস্থিতির প্রভাব এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার ওপর কেমন পড়বে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। মূলত ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং ইরান যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে এই নির্বাচনকে ঘিরে এশিয়ার দেশগুলো সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। এ অঞ্চলের জনমত ইরান যুদ্ধের বিপক্ষে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পকে বাধ্য করা কঠিন হবে বলে মনে করেন ওকুন।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এপ্যাক অ্যাডভাইজার্সের প্রধান নির্বাহী স্টিভেন ওকুন জানান, এশিয়ার প্রতিটি দেশই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের প্রতিটি পদক্ষেপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ আসলেও ইরান ইস্যু কিংবা বাণিজ্য শুল্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ওকুনের মতে, এটি অনেকটা রাজনৈতিক নাটকীয়তার মতো, কারণ শুল্কনীতি বা যুদ্ধ বিষয়ক কৌশল পরিবর্তনে কংগ্রেসের ক্ষমতা সীমিত। তবে কংগ্রেসে ট্রাম্পের দলের নিয়ন্ত্রণ কমলেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব এশিয়া অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে পরিমাণ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হতো, তা ব্যাহত হওয়ায় এশিয়া বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো নিজেদের অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশের বেশি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে থাকে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটের কারণে গত মার্চ থেকে ফিলিপাইনে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা বিরাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে এসব দেশ জ্বালানিসংকটে পড়ে। জ্বালানির সরবরাহে সংকট ও দাম বেড়ে যাওয়ায় গত মার্চ থেকে দেশটিতে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা চলছে। সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের (আইএসইএএস)-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার ও পূর্ব তিমুরের মতো অঞ্চলের দরিদ্র অর্থনীতিগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমেছে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি এশীয় দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত বছর মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের অজুহাতে প্রায় ৯০টি দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল।
এর মধ্যে কম্বোডিয়ার পণ্যে ৪৯ শতাংশ, লাওসে ৪৮ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৪৬ শতাংশ এবং মিয়ানমারে ৪৫ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়।
এছাড়া গত জুলাই মাসে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির অভিযোগ তুলে আরও ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়েছে।
বিশ্লেষক স্টিফেন ওলসনের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা যদি বড় ধাক্কা খায়, তবে দলটির মধ্যে মুক্তবাণিজ্যপন্থী অংশটি পুনরায় সক্রিয় হতে পারে। এমনটি ঘটলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রপ্তানিকারকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বাতাস বইতে পারে। তবে মার্কিন বাণিজ্যনীতিতে বড় কোনো কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য সম্ভবত ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ ফেলো জশুয়া কুরলানজিক জানান, এশিয়ার দেশগুলো ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কেবল বাণিজ্য সুবিধা চায় না, বরং তারা নিরাপত্তা নিশ্চয়তাও প্রত্যাশা করে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি তাদের কাছে কাম্য, যেখানে চীনের সঙ্গে এ অঞ্চলের পাঁচটি দেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। বেইজিংয়ের তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবির বিষয়টি এশীয় দেশগুলোর জন্য বাড়তি চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে।
চীনের প্রযুক্তি খাতের ওপর ওয়াশিংটনের কঠোর নীতি আরও জোরালো হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ যে দলের হাতেই থাকুক না কেন, চীনবিরোধী প্রযুক্তি বিধিনিষেধের বিষয়ে দুই দলের মধ্যে একধরনের ঐকমত্য রয়েছে। ‘রিমোট অ্যাকসেস সিকিউরিটি অ্যাক্ট’, ‘চিপ সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ এবং ‘ম্যাচ অ্যাক্ট’-এর মতো আইনের মাধ্যমে উন্নত চিপ বা এআই প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরবর্তী কংগ্রেস যে কোনো মূল্যে এই আইনগুলো পাস করার উদ্যোগ নেবে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছেন, তবুও কংগ্রেসে এই কঠোরতার চাপ অব্যাহত থাকবে। এমনকি ট্রাম্প এখনো তাইওয়ানের কাছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি অনুমোদন করেননি, যা মূলত বাণিজ্য সমঝোতা টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে ভোক্তাদের ওপর জ্বালানির বাড়তি দামের চাপ কমাতে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম সরকার বিপুল অর্থ ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় করেছে। এমনকি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অভিশংসনের উদ্যোগও দেখা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইন্দোনেশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেমস গিল্ড মনে করেন, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, এশিয়ার ব্যবসায়ীরা শুল্ক, অস্ত্র বিক্রি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন সমীকরণের অপেক্ষায় আছেন। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে ট্রাম্প দেশের ভেতরে চাপে পড়ে পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন কৌশল নিতে পারেন বলেও সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।




