Eng
কুষ্টিয়া, খুলনা, জাতীয়, লিড নিউজ

মানবপ্রেম জাগাতে লালনের দর্শন ধারণের আহ্বান বাউলের

প্রকাশিত: , ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ৫:৪৭ অপরাহ্ণ




ক্রাইম এডিশন অনলাইন:

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় বাউল সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে শুরু হয়েছে লালন উৎসব ও মেলা। তিন দিনের এই আয়োজন ঘিরে লালন আখড়ায় জড়ো হচ্ছেন ভক্ত, সাধক, সংগীতপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা। উৎসবের গান, আলোচনা ও সাধনচর্চার মধ্য দিয়ে লালনের মানবতাবাদী দর্শন নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। এই আয়োজনের মধ্যেই লালন দর্শনকে যথাযথভাবে ধারণ এবং মানবপ্রেম জাগ্রত করার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন প্রায় ৩৫ বছর ধরে লালনচর্চায় যুক্ত বাউল সাধক হৃদয় শাহ।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন একাডেমি চত্বরে শুরু হওয়া এ উৎসব চলবে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত। আয়োজনে রয়েছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং লালনসংগীতের আসর। লালনের জীবনদর্শন, তাঁর গান এবং মানবতার বাণী ঘিরে উৎসবের বিভিন্ন পর্ব সাজানো হয়েছে।
লালন আখড়ার পাশেই হৃদয় শাহের বাড়ি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি গুরুপরম্পরার ধারায় লালনচর্চা করে আসছেন। তাঁর মতে, লালন উৎসব কেবল মানুষের ভিড়, গান শোনা কিংবা আখড়া ঘুরে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হলে লালনের বাণী, দর্শন ও সাধনার ধারাকে উপলব্ধি করতে হবে।
হৃদয় শাহ বলেন, গুরুপরম্পরার নিয়ম অনুসরণ করেই সন্ধ্যায় মূল আয়োজন শুরু হয়। এরপর রাতে অধিবাস সেবা এবং পরদিন বাল্য সেবা ও দুপুরে পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটে। এই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে সাধক ও অনুসারীদের মধ্যে লালনচর্চার ঐতিহ্য বজায় থাকে।

উৎসব উপলক্ষে আখড়ায় মানুষের ব্যাপক সমাগম হলেও শুধু কিছুক্ষণ অবস্থান করে ফিরে গেলে লালনের দর্শনের গভীরতা উপলব্ধি করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন এই বাউল সাধক। তাঁর ভাষ্য, লালনের বাণী থেকেই তাঁদের জীবনচর্চার শিক্ষা আসে। সেই বাণীকে শুদ্ধভাবে ধারণ করা এবং বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানোই গুরুত্বপূর্ণ।
হৃদয় শাহের মতে, লালনের দর্শন অনুধাবনের জন্য আন্তরিকতা, অনুরাগ ও সাধনার প্রয়োজন। গুরুপরম্পরার কিছু বিষয় নির্দিষ্ট নিয়মে চর্চা করা হয়। তাই দর্শনার্থীদের কাছে লালনের দর্শনের সব দিক তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। তবে উৎসবে আসা মানুষের মধ্যে সত্য অনুসন্ধানের আগ্রহ বাড়ছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, অনেক দর্শনার্থী দূরদূরান্ত থেকে আখড়ায় আসেন। তাঁদের কেউ কেউ দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন, সাধকদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং লালনের দর্শন সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেন। হৃদয় শাহের চোখে, এই আগ্রহের মধ্যেই সত্যকে জানার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন রয়েছে।

লালনচর্চার অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে মানবপ্রেমকে গুরুত্ব দিয়েছেন হৃদয় শাহ। তাঁর মতে, লালনের দর্শন মানুষের বাইরের পরিচয়ের চেয়ে ভেতরের উপলব্ধি ও মানবিক বোধকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারলে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তিনি মনে করেন, ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে মানবপ্রেমের চর্চা প্রয়োজন। মানুষের মধ্যে মানবিকতার বীজ জাগ্রত করতে পারলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। লালনের বাণীকে শুধু সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনযাপনের অংশ করে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াকে ঘিরে প্রতিবছরই ভক্ত ও দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। তবে হৃদয় শাহের বক্তব্যে উঠে এসেছে, উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা শুধু জনসমাগমে নয়; বরং লালনের মানবতাবাদী দর্শন কতটা আন্তরিকভাবে মানুষ গ্রহণ করছে, তার মধ্যেই এর তাৎপর্য নিহিত। তাঁর আহ্বান, লালনের বাণীকে শুদ্ধভাবে ধারণ করে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সত্য অনুসন্ধানের চর্চা আরও বিস্তৃত করা হোক।