Eng
আন্তর্জাতিক, জাতীয়, ঢাকা, লিড নিউজ

সৌদিতে নির্যাতনের অভিযোগে ফিরছেন নারী কর্মীরা, ৯ মাসে ৯৭৯ জন

প্রকাশিত: , ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:১২ অপরাহ্ণ




নিজস্ব প্রতিবেদক:

সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, কর্মপরিবেশের প্রতিকূলতা এবং নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়ে দেশে ফিরছেন বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের একটি অংশ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে ফেরা ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মীর মধ্যে ৯৭৯ জনই সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে আসা এ পরিসংখ্যান বিদেশে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং কর্মপরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের আউটপাস-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই নয় মাসে দেশে ফেরত আসা নারী কর্মীদের প্রায় ৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশ সৌদি আরব থেকে এসেছেন। এ ছাড়া জর্ডান থেকে ২২৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৮ জন, ভারত থেকে ৫২ জন এবং মালয়েশিয়া থেকে ৪৮ জন নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। তবে বিদেশ থেকে ফিরে আসা সব কর্মীর পূর্ণাঙ্গ হিসাব সরকারের কাছে নেই। ফলে এসব পরিসংখ্যানের মাধ্যমে সমস্যার সামগ্রিক চিত্র পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
নির্যাতন ও প্রতিকূল পরিবেশে দেশে ফেরা
সাভারের শিলা বেগম জীবিকার সন্ধানে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যান। সেখানে একটি বাসায় কাজ করতেন তিনি। তবে কাজের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ এবং নানা সমস্যার কারণে এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গত এপ্রিলে দেশে ফিরে আসেন।

শিলার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হতো। পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের সুযোগ পেতেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি। এমনকি রান্নাঘরে ঘুমাতে হতো এবং বাড়ির বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতাও সীমিত ছিল বলে জানান। এসব পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
দোহারের জাহানারা বেগমের অভিজ্ঞতাও ছিল কষ্টের। পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। এ জন্য নিজের সম্পদ বিক্রি করার পাশাপাশি ধারদেনাও করতে হয়েছিল। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, নিয়োগকর্তার কাছ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব এবং তা প্রত্যাখ্যান করার পর নির্যাতনের শিকার হন। শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন তিনি।
শিলা ও জাহানারার অভিজ্ঞতা থেকে বিদেশে নারী গৃহকর্মীদের কর্মপরিবেশ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে প্রত্যেক কর্মীর পরিস্থিতি এক নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অভিযোগের যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ফেরত আসার পেছনে নানা কারণ

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে গিয়ে প্রত্যাশিত কাজ না পাওয়া, বেতন নিয়ে অসন্তোষ, অতিরিক্ত পরিশ্রম, শারীরিক অসুস্থতা, ভাষাগত সমস্যা এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে নারী কর্মীরা দেশে ফিরে আসেন। কিছু কর্মী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও করেন। যৌন হয়রানি ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশের অভিযোগও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
আউটপাসের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ১২৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৯৭ জন, মার্চে ৩০ জন, এপ্রিলে ২৩৬ জন, মে মাসে ১৬৭ জন, জুনে ১৬৯ জন, জুলাইয়ে ৩৩১ জন, আগস্টে ৩০৯ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২২০ জন নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। মাসভিত্তিক এই হিসাবে জুলাই ও আগস্টে ফেরত আসা কর্মীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি ছিল। সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব থেকে ১০৩ জন এবং জর্ডান থেকে ৬৪ জন নারী কর্মী দেশে ফেরেন।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীদের ৯৪ শতাংশ বিদেশে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই গবেষণায় ৪৭ শতাংশের যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার এবং ৮২ শতাংশের ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করার তথ্য উঠে এসেছে। এসব ফলাফল নারী অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

সৌদিমুখী শ্রমবাজারে নির্ভরতা
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে সৌদি আরবের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে যান। তাঁদের মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জনের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। চলতি বছরেও দেশটিতে কর্মী পাঠানোর প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
চলতি বছরে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নেওয়া ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন কর্মীর মধ্যে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৪৩ জন সৌদি আরবগামী ছিলেন। এই নির্ভরতা শ্রমবাজারের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং কর্মীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
অভিবাসন ও শরণার্থী-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, নারী কর্মীদের শুধু গৃহকর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তৈরি পোশাক, নির্মাণসহ অন্যান্য খাতে কাজের সুযোগ বাড়ানো দরকার। এ জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তাঁর মতে, হঠাৎ করে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ না করে ধাপে ধাপে এই খাতের ওপর নির্ভরতা কমানো যেতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মরত নারীদের জন্য নিরাপদ আবাসন, হোস্টেল বা ডরমিটরির ব্যবস্থা এবং কার্যকর অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কর্মস্থলে অন্য নারী-পুরুষ কর্মীদের সঙ্গে থাকার সুযোগ তৈরি হলে নিরাপত্তার ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

নিরাপত্তায় উদ্যোগ বাড়ানোর তাগিদ
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নারী কর্মীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য ১৩টি দেশে ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সৌদি আরবেও সেফ হোমের ব্যবস্থা রয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে কর্মীদের সুরক্ষা দিচ্ছে, তা মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ।
নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর আগে গন্তব্য দেশের আইন, চাকরির শর্ত, বেতন, কাজের সময় এবং অধিকার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। চুক্তিপত্র বুঝিয়ে দেওয়া, নিয়োগকর্তার পরিচয় যাচাই, নিয়মিত যোগাযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকাও জরুরি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীরা যেন তাঁদের অধিকার সম্পর্কে জানেন এবং সমস্যায় পড়লে কোথায় যোগাযোগ করবেন, তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন—এ বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

নারী শ্রমিকদের বিদেশে কর্মসংস্থান পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সেই সুযোগ যেন অনিরাপদ পরিবেশ, শোষণ কিংবা নির্যাতনের ঝুঁকিতে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বিকল্প শ্রমবাজার এবং দক্ষ কর্মী তৈরির উদ্যোগ জোরদার করা গেলে বিদেশে নারী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।