
নিজস্ব প্রতিবেদক:
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি বিলাসবহুল আবাসিক ভবনে পরিবার নিয়ে অবস্থান করছেন। তবে তার বর্তমান অবস্থান, সেখানে বসবাসের ধরন এবং সম্পত্তির মালিকানা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ব্যাংককের থন বুড়ি এলাকার চারোয়েন নাখোন রোডে অবস্থিত ৪২ তলাবিশিষ্ট ‘সুপালাই রিভার রিসোর্ট’ নামের আবাসিক ভবনের একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকছেন হানিফ। সেখানে তার নিজস্ব ফ্ল্যাট রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি ওই ভবনে বসবাস করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এমনকি সম্প্রতি ওই ভবনে তার সঙ্গে প্রতিবেদকের প্রতিনিধির সাক্ষাৎ ও কথোপকথন হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এদিকে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মাহবুব উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে মামলার প্রথম অভিযোগের ছয়টি কাউন্টে হানিফকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই মামলায় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা দণ্ডিত হয়েছেন। তাদের আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চার নেতার স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রির অর্থ জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপ্রক্রিয়ায় অনুপস্থিত ছিলেন চার আসামি
মামলার কার্যক্রম চলাকালে হানিফসহ চার আসামির কাউকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে মামলার বিবরণে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানায় খোঁজ করেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সন্ধান পায়নি বলে জানানো হয়।
পরে আত্মসমর্পণের জন্য দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে হাজির না হওয়ায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় বিচারিক কার্যক্রম।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ মামলার তদন্ত শুরু হয়। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। ৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পরদিন চার আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয় এবং ৮ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
তিন অভিযোগে বিচার, ছয়জন নিহতের ঘটনা
মামলায় চার নেতার বিরুদ্ধে মোট তিনটি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে আন্দোলন দমনে উসকানি ও সহায়তা, কুষ্টিয়ায় সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের নির্দেশ এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শহরটিতে ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনা অন্তর্ভুক্ত।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়া এবং দমন অভিযানে ভূমিকা রাখার সঙ্গে হানিফের সংশ্লিষ্টতা ছিল। ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
তৃতীয় অভিযোগে ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলিতে ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, বাবলু ফরাজী ও ইউসুফ শেখ। এসব ঘটনায় হানিফসহ চার নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন।
মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষের ১৯ জন সাক্ষ্য দেন। বিচারিক প্রক্রিয়ায় নথি ও বস্তুগত প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয় মামলাটি।
পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, চার আসামির অবস্থান বাংলাদেশে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তারা দেশের বাইরে থাকতে পারেন বলে ধারণা প্রকাশ করেন তিনি। আসামিদের গ্রেপ্তার অথবা দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর।
মামলার রায় নিয়ে প্রসিকিউশন সন্তোষ প্রকাশ করলেও রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী অসন্তোষ জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ব্যাংককে হানিফের অবস্থান সম্পর্কে প্রকাশিত দাবির বিষয়ে তার বক্তব্য বা স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
ফলে বিদেশে তার অবস্থান নিয়ে প্রকাশিত তথ্য এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধসংক্রান্ত রায়ের বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি।




