Eng
জীবনযাপন, লিড নিউজ

ঘিয়ের ব্যবসা থেকে ১৮৫ পদের মিষ্টি: বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের চার প্রজন্ম

প্রকাশিত: , ৩ নভেম্বর ২০২৬ | ৮:৩১ অপরাহ্ণ




অনলাইন ডেস্ক:

একসময় তাঁদের মূল পারিবারিক ব্যবসার ভিত্তি ছিল ঘি। সময়ের পরিক্রমায় সেই ব্যবসার গণ্ডি পেরিয়েছে অনেক দূর; ঘিয়ের গণ্ডি ছেড়ে তাঁরা এখন মিষ্টির জাদুকরী জগতে স্থায়ী আসন গেড়েছেন। দুধ, ছানা, ক্ষীর আর চিনির নিখুঁত মিশেলে তৈরি হয়েছে তাঁদের নতুন পরিচয়। দিনবদলের সঙ্গে বেড়েছে কর্মীর সংখ্যা, বিস্তৃত হয়েছে ব্যবসার পরিধিও। বর্তমানে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারে তৈরি হয় প্রায় ১৮৫ ধরনের মিষ্টি। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪৫টি শাখা রয়েছে। মুন্সিগঞ্জের বালাশুরে পারিবারিক আয়োজনে যোগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির এই দীর্ঘ যাত্রার কথা জানা গেল।

উদ্যোক্তাদের সঙ্গে দুগ্ধজাত পণ্যের সম্পর্ক বহু পুরোনো। ব্রিটিশ আমল থেকেই তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ঘিয়ের ব্যবসা করতেন। বর্তমান পরিচালক দীপক কুমার ঘোষ জানান, দুধ ও ঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ব্যবসাকে আরও বড় করার লক্ষ্যেই মিষ্টি তৈরির দিকে ঝুঁকেছিলেন তাঁরা। ঘি দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের ব্যবধানে রসগোল্লা, চমচম ও কালোজামের মতো নানা মিষ্টি তাঁদের মেনুর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

তবে তাঁদের প্রথম দোকানের নাম কিন্তু বিক্রমপুর ছিল না। পুরান ঢাকায় গড়ে ওঠা আদি প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ‘দেশপ্রিয় মিষ্টান্ন ভান্ডার’। তখনকার দিনে দোকানটির সকালের নাশতা আর দুধ চা বেশ জনপ্রিয় ছিল। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তাঁদের সবচেয়ে জনপ্রিয় পণ্য ছিল ঘি এবং ‘প্রাণহরা’ নামক একটি বিশেষ মিষ্টি। সাগরকলা ব্যবহার করে তৈরি করা এই মিষ্টির ইতিহাস প্রায় শত বছর পুরোনো। দুঃখজনকভাবে, সেই মিষ্টি তৈরির দক্ষ কারিগরেরা আজ বেঁচে নেই বলে সেই আদি স্বাদের প্রাণহরা তৈরি করা এখন প্রায় অসম্ভব। মিষ্টির ধরন অনুযায়ী এলাচি, দারুচিনি, জায়ফল, জয়ত্রী, লবঙ্গ ও চিনি ব্যবহার করা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে প্রয়াত রমেশচন্দ্র ঘোষের হাত ধরে কলাবাগানে যাত্রা শুরু হয় বর্তমানের ‘বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার’-এর। ঘোষ পরিবারের চতুর্থ প্রজন্ম এখন ব্যবসার হাল ধরেছে। প্রমিত কুমার ঘোষের তথ্যমতে, পরিবারের ২৪ জন সদস্য এখনো সম্মিলিতভাবে ব্যবসাটি পরিচালনা করছেন। এক প্রজন্ম যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, পরের প্রজন্ম তা ধারণ করেছে নিজেদের মতো করে।

মিষ্টির তালিকায় বৈচিত্র্য আনতে প্রতিনিয়ত কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। রসগোল্লা, লালমোহন, কালোজাম, চমচম ও ক্ষীর চমচমের মতো জনপ্রিয় মিষ্টিগুলো সারা বছরই পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি রসমালাই, সরমালাই, ক্ষীরমালাই, মালাই চপ, ইন্দ্রাণী ভোগ, জাফরানি ভোগ ও কাশ্মীরি চমচমসহ অনেক পদের সমাহার রয়েছে। তবে কিছু মিষ্টি রয়েছে যেগুলো কেবল নির্দিষ্ট মৌসুমেই মেলে। যেমন শীতকালে ক্ষীর কদমের চাহিদা তুঙ্গে থাকে। আবার কমলার মৌসুমে তৈরি করা হয় বিশেষ কমলাভোগ। প্রমিত কুমার জানান, অনেক দোকান সারা বছর কমলাভোগ বিক্রি করলেও, তাঁরা কমলার খোসা ও ছানার বিশেষ মিশ্রণে শুধু নির্দিষ্ট মৌসুমে এটি তৈরি করেন। এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও কিছু মিষ্টি রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ঋতুর সম্পর্ক গভীর। উপকরণের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ও নিজস্ব প্রস্তুতপ্রণালি বজায় রাখতে নির্দিষ্ট মৌসুমেই তৈরি করা হয় কয়েক ধরনের মিষ্টি। আবার পূজা-পার্বণ এলে বাড়ে লাড্ডুর চাহিদা।

মিষ্টির মান ও স্বাদ নিশ্চিত করতে দুধের মান ও কারিগরি দক্ষতার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়। মুন্সিগঞ্জের কাঁচামাল থেকে শুরু করে ঢাকা ও কলাবাগানের কারখানায় অভিজ্ঞ কারিগরের হাতেই তৈরি হয় প্রতিটি পদ। প্রমিত কুমারের দাবি, তাঁদের মিষ্টি তৈরিতে কোনো প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয় না। তবে ড্রাগন সুইটস, মাল্টি লাড্ডু ও কমলাভোগের মতো নির্দিষ্ট কিছু মিষ্টিতে সামান্য ফুড রেড কালার ব্যবহার করা হয়। প্রমিত কুমারের ভাষ্য, চিনির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হলে মিষ্টি কিছুটা বেশি সময় ভালো থাকে।

বর্তমানে সারা দেশে তাঁদের ৪৫টি শাখা থাকলেও, সামনে আরও শাখা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। একদিকে যেমন এক শাখার স্বাদ অন্য শাখায় ধরে রাখা কঠিন, অন্যদিকে বাজারের অসাধু ব্যবসায়ীদের নকল মিষ্টির দৌরাত্ম্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রমিত কুমার জানান, তাঁদের নাম ভাঙিয়ে নকল মিষ্টি বিক্রির প্রায় ৩০০টি ঘটনা তাঁরা শনাক্ত করেছেন এবং এদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অধীনে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ জন কর্মী কাজ করছেন, যার মধ্যে শতাধিক শুধু মিষ্টি তৈরির দক্ষ কারিগর। ঐতিহ্য ধরে রাখতে এই কারিগরদের অভিজ্ঞতাই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি।