
যুক্তরাষ্ট্রের সদ্যসমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন হিজাব পরিহিত পাঁচজন মুসলিম নারী। প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হিসেবে লড়ে তারা অঙ্গরাজ্য সিনেটর ও কংগ্রেস সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ইতিহাসে একসঙ্গে এতজন হিজাবধারী মুসলিম নারীর জয়লাভ এবারই প্রথম। এই ফলাফলকে ট্রাম্প প্রশাসনের ইসলামবিদ্বেষী নীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। এর মধ্যে হিজাব পরা চারজন অঙ্গরাজ্য সিনেটর এবং একজন কংগ্রেস সদস্যের বিজয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। মঙ্গলবারের এ নির্বাচনে এমন ফলাফলকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছে সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। এর আগেই তিনি দুই বছর ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাওয়াস বলেছিলেন, নিজের নতুন শহরে সম্মিলিত উদ্যোগ ও নাগরিক অংশগ্রহণকে মানুষের মধ্যে বিভেদ দূর করার একটি পথ হিসেবে দেখেন তিনি। এই নির্বাচনি ফলাফলকে ‘ব্লু ওয়েভ’ বা ডেমোক্র্যাটদের নীল ঢেউ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। রোমান ও কাওয়াসের মতো নাবিলাও ইসরাইলের সমালোচনা করেছেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে হুমকি ও বিদ্রূপের ঘটনা বেড়েছে। এসব নারী রাজনৈতিক প্রচারণাকালে নিয়মিতভাবে রিপাবলিকান রাজনীতিক, অনলাইন ট্রল এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিদ্বেষপূর্ণ আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তাদের ধর্মীয় পোশাক ও পরিচয় নিয়ে তোলা হয়েছে নানা প্রশ্ন।
নির্বাচনের আগে মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল (এমপ্যাক) যুক্তরাষ্ট্রে উগ্র ডানপন্থি এবং ইসলামবিদ্বেষী উসকানিদাতাদের সক্রিয়তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিল। সংস্থাটির আশঙ্কা ছিল, এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর দাবি তোলা হতে পারে, যা মুসলিম আমেরিকান ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করবে। তবে সব প্রতিকূলতা জয় করে এবার বেশ কয়েকজন প্রকাশ্যে মুসলিম পরিচয় বহনকারী তরুণী নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। তবে ভোটারদের উপস্থিতির বিস্তারিত চিত্র এখনো পর্যালোচনাধীন।
জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে স্টেট সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন রুয়া রোমান। রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত এই অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় তিনি ছিলেন হিজাব পরা প্রথম মুসলিম নারী। এবার স্টেট সিনেটর হিসেবে নিজের অবস্থান আরও পোক্ত করলেন তিনি। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় তিনি জাতীয়ভাবে পরিচিতি পান। ওই সময় তিনি ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধি হিসেবে ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন, তবে তার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, রোমানের দাদা জেরুজালেমে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
নিউইয়র্কের স্টেট সিনেটে আগামী জানুয়ারিতে যোগ দিচ্ছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আবের কাওয়াস। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের ওপর যে কঠোর নজরদারি ও দমন-পীড়ন শুরু হয়েছিল, তা কাওয়াসের পরিবারের ওপরও প্রভাব ফেলেছিল। এফবিআইয়ের নজরদারি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভিযানের ধারাবাহিকতায় তার বাবাকে প্রায় তিন বছর আটক রেখে জর্ডানে ফেরত পাঠিয়েছিল অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই)। সে সময়ের সেই সহিংস গ্রেপ্তার অভিযান দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল, যা এবার ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পথ সুগম করতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এদিকে দিনের আলোয় জনসমক্ষে আইসিইর সহিংস গ্রেপ্তার অভিযান যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে ২৭ বছর বয়সী স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ নাবিলা সৈয়দ ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই নারী ২০২২ সালে আইনসভার শূন্য আসনে নিয়োগ পাওয়ার পর এবার সরাসরি ভোটে জয়ী হলেন। তার কাজের প্রধান এজেন্ডা ছিল স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে রাখা। বৃহত্তর শিকাগোর প্রভাবশালী পত্রিকা ‘শিকাগো ট্রিবিউন’ ও ‘দ্য ডেইলি হেরাল্ড’ তাকে সমর্থন দিয়েছিল। সম্প্রতি তাকে সমর্থন জানিয়েছে বৃহত্তর শিকাগো এলাকায় প্রচারিত ১৫০ বছরের পুরোনো সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি হেরাল্ড’ এবং প্রভাবশালী ‘শিকাগো ট্রিবিউন’।
নাবিলা সৈয়দ ও অন্যান্য নারী আইনপ্রণেতারা ফিলিস্তিন ইস্যুতে সোচ্চার ছিলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের হামলার পরদিন নাবিলা ইলিনয়ের কয়েকজন আইনপ্রণেতার সঙ্গে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। চিঠিতে ওয়াশিংটনের প্রতি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছিল। যদিও সমালোচকেরা এই উদ্যোগকে হামাসের প্রতি সমর্থন হিসেবে দাবি করে বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করেছিলেন, তবে চিঠিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছিল যে, মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে রেখে শান্তি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। উল্লেখ্য, যুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় যুদ্ধবিরতির পথ তৈরিতে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল।
কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের স্টেট সিনেটে যোগ দিতে যাচ্ছেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মরিয়ম খান। ২০২২ সাল থেকে দায়িত্ব পালনরত এই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। প্রাথমিক বাছাইয়ে দলের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী প্রার্থীকে হারিয়ে তিনি সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। আইনসভায় থাকাকালে তিনি বিশেষ শিক্ষাবিষয়ক সিলেক্ট কমিটির চেয়ারম্যান এবং বিচার বিভাগীয় কমিটিতে কাজ করেছেন।
কানেকটিকাট স্টেট সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা বব ডাফ মরিয়ম খানকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে স্বাগত জানিয়েছেন।
তাকে বিশেষ শিক্ষার শিক্ষক এবং শিশুদের অধিকার আদায়ে নিবেদিত যোদ্ধা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।
চলতি বছরের শুরুতে নিজের ডেস্কে পাকিস্তানের পতাকা রাখায় রিপাবলিকানদের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন মরিয়ম।
এর জবাবে তিনি ‘দ্য কানেকটিকাট মিরর’কে বলেন, নিজের ঐতিহ্য ও গর্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই তিনি পতাকাটি রেখেছিলেন, যা অবিশ্বস্ততার প্রতীক নয়। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অংশীদারিত্ব রয়েছে। নিজের শিকড় ও পরিচয় স্বীকার করার মানে এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বা জনগণের সেবায় তার অঙ্গীকারে কোনো ঘাটতি রয়েছে। সহিংসতার মূল কারণ—অর্থাৎ অসমতা—দূর করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগোতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই।’। এটিকে অনুপযুক্ত বা অবিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে দেখার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।’। নিজের শিকড় ও পটভূমিকে স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কিংবা কানেকটিকাটের মানুষের সেবা করার ক্ষেত্রে আমার অঙ্গীকার কমে গেছে।’।




