
কারাবন্দী স্বামীকে শেষবারের মতো স্ত্রী ও সন্তানের মুখ দেখানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্সযোগে মরদেহ নিয়ে যশোর কারাগারে যাওয়ার হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় মানবিকতা, আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বাস্তব চিত্রও তুলে ধরেছে।
শনিবার বিকেলে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে ২২ বছর বয়সী কানিজ সুবর্ণা ও তাঁর মাত্র ৯ মাস বয়সী ছেলে সেজাদ হাসানের মরদেহ উদ্ধার হয়। নিহত কানিজ সুবর্ণার স্বামী জুয়েল হাসান একটি মামলায় যশোর কারাগারে বন্দী রয়েছেন। পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে স্বামী কারাগারে থাকায় মানসিক চাপে ভুগছিলেন সুবর্ণা।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্র জানায়, স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে না পারা, সংসারের অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক চাপ—সব মিলিয়ে কানিজ সুবর্ণা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি চরম সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনার পরপরই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর খবর পেয়ে জুয়েল হাসানের পরিবার তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার জন্য কারা কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি। ফলে স্ত্রী ও সন্তানের মুখ শেষবারের মতো দেখতে জুয়েল হাসানকে কারাগারের ফটকেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। জানাজা কিংবা দাফনে অংশ নেওয়ার সুযোগও পাননি তিনি।
আইন অনুযায়ী, নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু হলে একজন বন্দীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা জেলা প্রশাসনের হাতে থাকে। তবে বাস্তবে প্রশাসনিক জটিলতা, সময়ক্ষেপণ কিংবা অন্যান্য কারণে অনেক সময় তা কার্যকর হয় না—এই ঘটনাও তারই একটি উদাহরণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার ছবি ও বিবরণ ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—মানবিক বিবেচনায় এমন ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কি সম্ভব ছিল না? কেউ কেউ এটিকে প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলেও মন্তব্য করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি থাকলে এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। তারা মনে করেন, জরুরি ও মানবিক ঘটনায় প্যারোল ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও দ্রুত করার প্রয়োজন রয়েছে।
এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল—আইনের কঠোরতা ও মানবিকতার ভারসাম্য না থাকলে তার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই। একটি শিশুর ভবিষ্যৎ, একটি মায়ের জীবন এবং একজন বাবার আজীবন বেদনা—সবকিছু মিলিয়ে এই ট্র্যাজেডি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।