Eng
অপরাধ, চট্টগ্রাম, জাতীয়, লিড নিউজ

সাত মাস পর এক পা হারিয়ে বাড়ি ফিরল শিশু রায়হান

প্রকাশিত: , ১৪ ২০২৬ | ০:৪৯ অপরাহ্ণ




নিজস্ব প্রতিবেদক:

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় সাত মাস নিখোঁজ থাকার পর ১২ বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ রায়হানকে এক পা হারানো অবস্থায় ফিরে পাওয়ার ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর শিশুটিকে একটি চক্রের কবলে পড়তে হয়েছিল। পরে তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সাত মাস আগে মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল রায়হান। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। গত ১৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে চট্টগ্রামের চুনতি এলাকায় একটি সীরাত মাহফিলে এক পায়ে ভর করে ভিক্ষা করতে দেখা যায় তাকে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা শিশুটিকে চিনতে পেরে পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। পরে বাবা সেখানে গিয়ে ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন বলে জানা গেছে।
রায়হানের বর্ণনা অনুযায়ী, বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে প্রথমে কক্সবাজারে যায়। সেখানে কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয়ের পর ট্রেনের ছাদে করে ঢাকায় যাওয়ার কথা জানায় শিশুটি। এরপর কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে তাকে একটি নির্জন ধরনের জায়গায় নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তার।
শিশুটির ভাষ্য, ওই স্থানে তার মতো আরও কয়েকজন শিশু ছিল। একপর্যায়ে সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখতে পায় তার একটি পা নেই। কেন এমন হয়েছে জানতে চাইলে তাকে ট্রেন দুর্ঘটনার কথা বলা হয়েছিল বলে রায়হান জানিয়েছে। পরে হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাকে ভিক্ষা করানো হতো বলেও শিশুটি দাবি করেছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, রায়হানের শরীরে অস্ত্রোপচারের চিহ্ন রয়েছে এবং পেট ও পিঠে বড় ধরনের কাটা দাগ দেখা গেছে। এসব কারণে শিশুটির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে কোনো অপরাধী চক্র জড়িত কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছে পরিবার। তবে বিষয়টি এখনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি।
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন পেশায় অটোরিকশাচালক। তিনি বলেন, ছেলেকে ১০০ টাকা দিয়ে চুল কাটতে পাঠানোর পর থেকেই নিখোঁজ ছিল। আর্থিক সংকটের কারণে তখন থানায় সাধারণ ডায়েরি করার সুযোগ হয়নি বলেও তিনি জানান।
বাবার অভিযোগ, ছেলেকে ফিরে পাওয়ার পর থানায় গিয়ে আইনি সহযোগিতা চাইলে ঘটনাটি ঢাকার কমলাপুর এলাকার বলে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। ঢাকায় গিয়ে মামলা বা অভিযোগ করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তার নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একজন জানান, সীরাত মাহফিলের ভিড়ের মধ্যে এক পায়ে ভর করে ভিক্ষা করা শিশুটিকে দেখে তার পরিচিত মনে হয়। নাম জানতে চাইলে রায়হান নিজের পরিচয় দেয়। পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে শনাক্ত করা হয় বলে জানা গেছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মানবাধিকারকর্মীরাও ঘটনার তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের বক্তব্য, শিশুটির সঙ্গে কী ঘটেছে তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
লোহাগাড়া থানা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রায়হান নিখোঁজ হওয়ার সময় তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো জিডি বা অভিযোগ করা হয়নি। শিশুটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনাটির একটি অংশ কক্সবাজার ও ঢাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এদিকে, রায়হান নিখোঁজ থাকার সময় কমলাপুর এলাকায় তার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা গেছে। ওই ভিডিওতে শিশুটিকে ভিন্ন ধরনের কিছু বক্তব্য দিতে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যদের ধারণা, ভয় বা কারও প্রভাবে সে এমন বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারে। তবে এর সত্যতা যাচাই করাও তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে বিপুলসংখ্যক সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে হাজার হাজার শিশু উদ্ধার হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে। তবে এসব নিখোঁজের সঙ্গে শিশু পাচার বা অঙ্গ পাচারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
রায়হানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন পরিবারের মূল দাবি, শিশুটির সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল তা দ্রুত বের করা এবং দায়ীদের শনাক্ত করা। একই সঙ্গে নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকারকর্মীরা।
উল্লেখ্য, রায়হানের পরিবারের অভিযোগ ও শিশুটির বক্তব্যের ভিত্তিতেই এসব তথ্য উঠে এসেছে। ঘটনার সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের সম্পৃক্ততা তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।