
ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
বাংলাদেশের নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন, গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, ব্যাংকিং খাত এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতেই এসব অভিযোগ ও মূল্যায়ন সামনে এসেছে।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাস পার হয়েছে। এখন সরকারের কর্মকাণ্ডকে শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, বাস্তব ফলাফল, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহির বিষয় বিবেচনা করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, গণভোটে সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে জনগণের রায় এলেও সেই অনুযায়ী সংস্কার পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়ন কাঠামো কার্যকর হয়নি। এ ক্ষেত্রে সরকার বিকল্প প্রক্রিয়ার দিকে এগিয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জামায়াত। মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এর প্রভাব শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন খাতে পড়ছে বলে দাবি করা হয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে। হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মব সহিংসতার বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে জামায়াত দাবি করেছে, এসব ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত সব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা হয়নি।
প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়নে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দ্রব্যমূল্য নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেছে জামায়াত। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো বেশি। খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর চাপ তৈরি করছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের তারল্য সংকট এবং আমানতকারীদের আস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের এই নেতা। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
পররাষ্ট্রনীতি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং গুম প্রতিরোধে প্রস্তাবিত আইন নিয়েও বক্তব্য দেয় জামায়াত। দলটির দাবি, এসব ক্ষেত্রেও আরও সুস্পষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সামনে আট দফা প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়সীমাভিত্তিক পরিকল্পনা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার এবং গুম প্রতিরোধ আইনে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণ সরকারের কাছে সমস্যার ব্যাখ্যা নয়, কার্যকর সমাধান প্রত্যাশা করে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী সময়ে সরকারকে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দৃশ্যমান ফলাফল দেখাতে হবে।
তবে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সরকারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ও মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো দলটির নিজস্ব বক্তব্য। এসব দাবির বিষয়ে সরকারের বক্তব্য বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে সংশ্লিষ্ট দলের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।