
ক্রাইম এডিশন অনলাইন:
বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টসের (বিআরআইসিএম) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মালা খানের নিয়োগ ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অডিটে একাধিক আপত্তি উঠেছে। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ না করেই তাকে নিয়োগ দেওয়ার কারণে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ১ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খাতে অনিয়মিত ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪ কোটি ৬১ লাখ ৯৯ হাজার ৫৩১ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের কমপ্লায়েন্স অডিটে এসব আপত্তি উত্থাপন করে ডাক, টেলিযোগাযোগ, বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তি অডিট অধিদপ্তর। চলতি বছরের ২৮ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত বিআরআইসিএমের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে মোট ১৩টি আপত্তি দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছয়টি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম এবং সাতটি সাধারণ আর্থিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রির পাশাপাশি ডিগ্রি অর্জনের পর ১৪ বছরের গবেষণা অভিজ্ঞতা ও বিশেষ অবদানের শর্ত ছিল বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাছাই কমিটির সভায় মালা খানের প্রয়োজনীয় গবেষণা অভিজ্ঞতা ও অবদানের যথাযথ প্রমাণ না থাকায় তার আবেদন বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছিল।
পরে তার পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত নয়—এমন তথ্যও উঠে আসে। এরপরও তার আবেদন পুনর্বহাল করা হয়। ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট বিসিএসআইআরের ডিপিসি-১ তাকে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগের সুপারিশ করে। তবে পরবর্তীতে বিসিএসআইআর বোর্ডের সভায় সেই সুপারিশ অনুমোদন পায়নি।
এরপর ২০১৭ সালে মালা খান হাইকোর্টে রিট করেন এবং সেখানে তার পক্ষে রায় আসে। পরে সরকার আপিল বিভাগে যায়। ওই বছরের ২৩ আগস্ট আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। তবে এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে নিয়োগ নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ২৫ মে মালা খানকে সাময়িক বরখাস্ত করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে আদালতের আদেশের মাধ্যমে ওই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা স্থগিত হয়। এর আগে ২০২২ সালে একটি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের তদন্তেও তাকে দায়ী করা হয়েছিল বলে বিআরআইসিএমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ওই ঘটনায় নেওয়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও আদালতের স্থগিতাদেশ নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
অডিটে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য আর্থিক বিষয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে পারসোনাল লেজার খাত থেকে ব্যয় না দেখিয়ে ৪৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা উত্তোলন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া ৬২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ফেলোশিপ ভাতা হিসেবে ব্যয় এবং বিল পরিশোধের সময় বিধি অনুযায়ী আয়কর ও ভ্যাট না কাটায় প্রায় ২১ লাখ টাকার ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বাজেট বরাদ্দের শর্ত অনুসরণ না করে বিল পরিশোধের মাধ্যমে ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা অনিয়মিত ব্যয়ের কথাও বলা হয়েছে।
এসব বিষয়ে অডিট অধিদপ্তর গত ১০ আগস্ট বিআরআইসিএমকে আপত্তির জবাব দিতে চিঠি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে অডিট আপত্তির জবাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। মালা খানের মামলাটি আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
অন্যদিকে, মালা খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। মোবাইল ফোনে পাঠানো বার্তায় তিনি অভিযোগগুলো সত্য নয় বলে জানিয়েছেন এবং নিজের পক্ষে তথ্যপ্রমাণ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে পরে নির্ধারিত সময়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।




