
নিজস্ব প্রতিবেদক:
স্কুলের পাঠ্যবইয়ে শেখা গণিতের সব সূত্র কর্মজীবন কিংবা দৈনন্দিন জীবনে সমানভাবে কাজে লাগে না। বিশেষ করে জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতির জটিল সূত্র মুখস্থ করার চাপ শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা প্রয়োজনীয়, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন নয়, বরং শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করাও হওয়া উচিত।
যুক্তরাজ্যে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে চলমান আলোচনায় উঠে এসেছে, গণিতের পাশাপাশি শিশুদের কথা বলা, যুক্তি উপস্থাপন, মনোযোগ দিয়ে অন্যের বক্তব্য শোনা এবং মতবিনিময়ের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব গুণ ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় পাঠকদের চিঠিতে এসব মতামত উঠে আসে। ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত সাইমন জেনকিনসের একটি নিবন্ধে শিশুদের এমন গণিত শেখানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, যা ভবিষ্যৎ জীবনে অধিকাংশেরই প্রয়োজন হয় না। এর পরিবর্তে সাবলীলভাবে কথা বলা ও যোগাযোগের দক্ষতা তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব আলোচনায় আসে।
শিক্ষায় যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ
শিক্ষায় পড়া, লেখা ও গণিতের পাশাপাশি মৌখিক যোগাযোগকে চতুর্থ মৌলিক দক্ষতা হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে। ‘অরেসি’ নামে পরিচিত এ ধারণার মূল লক্ষ্য হলো নিজের চিন্তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা, অন্যের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা, যুক্তি দিয়ে মতামত তুলে ধরা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত আলোচনা, বিতর্ক ও দলগত কাজের মাধ্যমে এ দক্ষতা গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এতে শিক্ষার্থীরা শুধু নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করতেই শিখবে না, বরং অন্যের মতামত বোঝা ও মতপার্থক্য সামলানোর সক্ষমতাও অর্জন করতে পারবে।
ইংল্যান্ডের শিক্ষাসচিব লুসি পাওয়েলের পরিকল্পিত শিক্ষাক্রম সংস্কারেও মৌখিক সাবলীলতা ও ব্যবহারিক দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে এসেছে। কম্পিউটারনির্ভর কাজের চাপ কমানোর বিষয়টিও এ আলোচনার অংশ। তবে এসব পরিবর্তনের বাস্তবায়ন ও পরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত পরিকল্পনা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পরীক্ষার ফলই কি শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষিত কর্মীর চাহিদা বাড়ার সঙ্গে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটে। একই সময়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয় বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে পরীক্ষার ফল, নম্বর ও পাঠ্যসূচিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের প্রবণতা বাড়ে। এতে সৃজনশীলতা, ব্যক্তিগত বিকাশ এবং বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের আলোচনায় বলা হচ্ছে, মৌলিক গণিত শেখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। হিসাব-নিকাশ, অর্থ ব্যবস্থাপনা, পরিমাপ এবং দৈনন্দিন নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে উচ্চতর পর্যায়ের জটিল সূত্র ও সমীকরণের ক্ষেত্রে কোন বিষয় কতটা প্রয়োজনীয়, তা শিক্ষার্থীদের বয়স, শিক্ষার লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিবেচনা করা যেতে পারে।
জিসিএসই পরীক্ষায় গোলকের আয়তন নির্ণয়ের মতো প্রশ্নের উদাহরণ দিয়ে নিবন্ধে বোঝানো হয়েছে, এমন কিছু গাণিতিক বিষয় অধিকাংশ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রয়োগের সুযোগ সীমিত হতে পারে। এ ধরনের বিষয় শেখার চাপ কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে গণিতভীতি তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রযুক্তির প্রভাবেও বদলাচ্ছে যোগাযোগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্মার্টফোনের বিস্তৃত ব্যবহার মানুষের যোগাযোগের ধরনেও পরিবর্তন আনছে। সরাসরি কথা বলার পরিবর্তে বার্তা আদান-প্রদানের প্রবণতা বাড়ায় সামনাসামনি আলোচনা ও মতবিনিময়ের চর্চা কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
নিবন্ধে উদ্ধৃত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে মানুষের প্রতিদিন উচ্চারিত শব্দের সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। এ ছাড়া তরুণদের এক-চতুর্থাংশ জানিয়েছে, আগে থেকে নির্ধারিত না থাকলে তারা ফোনকলের উত্তর দেয় না। তবে এসব তথ্যের প্রেক্ষাপট ও গবেষণার পরিধি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন।
ব্যবহারিক শিক্ষায় প্রয়োজন সময় ও প্রশিক্ষণ
মৌখিক যোগাযোগ ও বাস্তবমুখী শিক্ষার ধারণা নতুন নয়। প্রাচীন গ্রিস ও রোমে বক্তৃতা ও যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে স্টেইনার ও মন্টেসরি শিক্ষাধারাতেও শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ও নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের উইনচেস্টার কলেজে প্রতিদিন এক ঘণ্টা আলোচনার জন্য বরাদ্দ রাখার উদাহরণও নিবন্ধে এসেছে। এসব পর্বে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, দর্শন, রাজনীতি, সংগীত ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কথা বলে। ২০২৪ সালের অরেসি কমিশনের প্রতিবেদনেও মৌখিক যোগাযোগের দক্ষতা বিকাশের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এ ধরনের পদ্ধতি কার্যকরভাবে চালু করতে পর্যাপ্ত সময়, অর্থায়ন ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন। কারণ, যোগাযোগ দক্ষতা কেবল বই পড়ে অর্জন করা সম্ভব নয়; নিয়মিত অনুশীলন ও পারস্পরিক অংশগ্রহণও জরুরি।
সব মিলিয়ে শিক্ষার কাঠামোয় মৌলিক গণিতের গুরুত্ব বজায় রেখে মুখস্থনির্ভরতা কমানো এবং যুক্তিবোধ, যোগাযোগ ও ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবনের প্রয়োজন বিবেচনায় পাঠ্যক্রম সাজানোর ওপরই এ বিতর্কের মূল গুরুত্ব।


