
ক্রাইম এডিশন, ডেস্ক রিপোর্ট:
রংপুরের বাজারে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়ায় কিছু পণ্যের দাম কমেছে। এতে ক্রেতাদের মধ্যে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও চাল, মাংস, ডিমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশ কিছু পণ্যের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আয় ও ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে প্রতিদিনই নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
গত আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত রংপুরের পাইকারি ও খুচরা বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দামে ওঠানামা দেখা গেছে। কোনো কোনো সবজির দাম কমেছে, আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বেড়েছে। মাছ, মাংস ও চালের দাম মোটামুটি একই পর্যায়ে থাকলেও ক্রেতাদের অভিযোগ, বর্তমান আয় দিয়ে পরিবারের নিয়মিত খাদ্যচাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষ দিকে কার্ডিনাল আলু প্রতি কেজি ২২ থেকে ২৫ টাকা, সাদা আলু ৩৫ থেকে ৪০ টাকা এবং লাল পাকড়ি আলু ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে কার্ডিনাল আলুর দাম কমে ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং দেশি সাদা আলু ২০ থেকে ২৫ টাকায় নেমে আসে।
শিমের দামেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। আগস্টে প্রতি কেজি শিম ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হলেও অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে তা কমে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, টমেটো ও গাজরের দাম আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা থাকলেও অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে একপর্যায়ে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় ওঠে। পরে আবার কমে ১২০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে আসে। কাঁকরোল, ঝিঙা ও ফুলকপির বাজারেও বিভিন্ন সময়ে দামের পরিবর্তন হয়েছে।
সিটি বাজারের সবজি বিক্রেতা আলমগীর হোসেনের ভাষ্য, বাজারে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বেড়েছে। ফলে আগের সপ্তাহের তুলনায় অধিকাংশ সবজির দাম কমেছে। সরবরাহ বাড়তে থাকলে সামনে দাম আরও কমতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
স্টেশন বাজারের বিক্রেতা ইমরান হোসেন বলেন, মাসের শেষ দিকে ক্রেতাদের কেনাকাটা কমে যাওয়ায় বিক্রিও কমে যায়। এর প্রভাব কিছু সবজির দামে পড়েছে।
সীমিত আয়ে সংসার চালাতে বাড়ছে চাপ
রংপুর নগরীর শাপলা চত্বরের খান বহুমুখী মার্কেটে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মশিউর রহমানের চার সদস্যের পরিবার। তিনি জানান, এক হাজার টাকায় দুই দিনের বাজার করাও কঠিন। সংসারের খরচ মেটাতে হিসাব করে কেনাকাটা করতে হয়। কিন্তু খরচ কমাতে গেলে শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তার মতে, মাসের ২০ তারিখের পর অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারের হাতে প্রয়োজনীয় খরচ চালানোর মতো অর্থ থাকে না।
কামাল কাছনা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাসকারী কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক রবিউল ইসলামও বাজারের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। সামান্য বেতন ও টিউশনের আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে তাকে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে। তার অভিযোগ, শীতকালীন সবজির অনেক পণ্যও তুলনামূলক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আগে তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় অনেক পরিবার ডিমের ওপর নির্ভর করলেও এখন সেটিও ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
ডিম, মাংস ও চালের দামেও স্বস্তি সীমিত
বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কেজিপ্রতি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে ছিল। সোনালি মুরগি আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ৩১০ থেকে ৩২০ টাকা থেকে কমে প্রায় ৩০০ টাকায় নামলেও অক্টোবরে আবার ৩১০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দেশি মুরগির দাম ছিল ৫৪০ থেকে ৫৭০ টাকার মধ্যে।
পোলট্রি মুরগির লাল ডিমের দামও খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি। আগস্টের শেষ সপ্তাহে প্রতি হালি ডিম ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা ছিল। সেপ্টেম্বরে তা ৪৮ থেকে ৫০ টাকায় উঠলেও অক্টোবরে আবার ৪৬ থেকে ৪৮ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। তবে আকার ও বাজারভেদে দামে পার্থক্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।
নগরীর লালবাগের একটি ছাত্রাবাসে থাকা বকুল চন্দ্র রায় বলেন, কোথাও এক হালি ডিম ৪৮ টাকা, আবার কোথাও ৫০ থেকে ৫২ টাকা চাওয়া হচ্ছে। তার মতে, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ডিম কেনাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
মাংসের বাজারেও ক্রেতাদের ব্যয়ের চাপ রয়েছে। গরুর মাংস কেজিপ্রতি ৭২০ থেকে ৭৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রংপুরের বিভিন্ন বাজারে গত তিন মাসে এসব দামে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।
ক্রেতা ইকবাল সুমনের ভাষ্য, আধা কেজি মাংস কিনতেই ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ হলে চাল-ডালসহ অন্য প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার বাজেট কমে যায়। এতে পরিবারের খাদ্যতালিকায় মাংস রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
চালের বাজারেও উল্লেখযোগ্য স্বস্তি নেই। স্বর্ণা মোটা চাল কেজিপ্রতি ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, বিআর-২৮ চাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং মিনিকেট ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ২৫ কেজির চালের বস্তায় গত তিন মাসে প্রকারভেদে ১৩০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে বলে বাজারের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২০৫ থেকে ২১০ টাকা, খোলা সয়াবিন ২০০ থেকে ২২০ টাকা, মসুর ডাল ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা এবং মুগ ডাল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেট ময়দার দাম আগস্টের ৬৫ থেকে ৭০ টাকা থেকে বেড়ে অক্টোবরে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায় পৌঁছেছে।
বাজার তদারকির ওপর গুরুত্ব
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) রংপুর জেলা সভাপতি আব্দুর রহমানের মতে, বিভিন্ন অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রবণতা থাকায় ভোক্তারা অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়েন। বাজার তদারকিতে সরকারি সংস্থাগুলোর আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রংপুর জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, বাজারে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। তার ভাষ্য, তদারকির সময় দাম কমলেও পরবর্তী সময়ে আবার বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। এ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের বাজারও নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বৃদ্ধিতে রংপুরের বাজারে কিছুটা স্বস্তি এলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের ব্যয় কমেনি। ফলে বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকলেও সীমিত আয়ের মানুষের কাছে তা এখনো বড় চাপ হয়ে রয়েছে।



