
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:
গত বছরের ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় এক নৃশংস ঘটনা ঘটে। কেউ স্লোগান দিচ্ছিলেন, কেউ বিলি করছিলেন প্রচারপত্র। এর পর থেকে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুজনের বিরোধ চলছিল। তাঁর ভাষায়, ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার মতো ঘটনা ঘটেছে।
বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগ চলাকালে নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যে এক যুবক পেছন থেকে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলার ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে তিনটি গুলি করেন। চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগে তাঁকে গুলি করা হয়। গুলি করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৬ সালের দিকে সরোয়ার নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন। এ কারণে সরোয়ার সতর্কভাবে চলাফেরা করতেন। এ জন্য নির্বাচনী জনসংযোগের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানকে বেছে নেওয়া হয়।
ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়া সরোয়ারকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ওই ব্যক্তি।
এই ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই বাঁহাতি শুটারকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ এবং উদ্ধার হয়নি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি। ভালোভাবে প্রশিক্ষিত কেউ এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সন্ত্রাসীদের দলে প্রশিক্ষিত শুটার, দুশ্চিন্তায় পুলিশ। সুষ্ঠু তদন্ত করে পুলিশ বের করুক।’।
নিহত সরোয়ার হোসেন চট্টগ্রাম নগরে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ ১৫টি মামলা ছিল। সরোয়ারের বাবা আবদুল কাদের ঘটনার পরদিন বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা করেন। মামলায় বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১৫ জনকে আসামি করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১০ জন কারাগারে রয়েছেন এবং বাকিরা জামিনে মুক্ত। সরোয়ার হত্যা মামলায় গত ২৮ অক্টোবর আদালত তাঁর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, সরোয়ারের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে হতে পারে। ঘটনাস্থলের আশেপাশে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় ও পরিকল্পিতভাবে জনবহুল স্থান বেছে নেওয়ায় অপরাধীকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের সঙ্গে আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ববিরোধের জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়। তবে এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক কারণ আছে কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিহতের বাবা আবদুল কাদের বলেন, ঘটনার তিন দিন আগে মো. রায়হান সরোয়ারকে ফোন করে হুমকি দিয়েছিলেন যে, ‘তোর সময় শেষ, যা খাওয়ার খেয়ে নে।’ বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী ও তাঁর সহযোগীরাও সরোয়ারকে বারবার হুমকি দিতেন। ছেলের হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় চরম হতাশ আবদুল কাদের বলেন, চোখের সামনে যেভাবে ছেলেকে গুলি করে মেরেছে, তা ভোলা সম্ভব নয়। কিন্তু পুলিশ এখনো প্রধান শুটারকে ধরতে পারেনি। পরে গুরু-শিষ্যের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
নিহত সরোয়ারের ভাই ও বায়েজিদ থানা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজ উদ্দিনের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধের কারণেই তাঁর ভাইকে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরোয়ার বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হওয়ায় দলের ভেতরেই কিছু নেতার বিরাগভাজন হয়েছিলেন।
তাঁর দাবি, পুলিশ ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করলেও প্রকৃত পরিকল্পনাকারীদের অনেকেই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অনেক নিরীহ ব্যক্তিকে হয়রানি করে আটক করা হয়েছে, অথচ মূল অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন জানান, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। নিরীহ কাউকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, সরোয়ার হত্যার নেপথ্যে রাজনৈতিক কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সাজ্জাদ, মো. রায়হান ও বোরহান এখনো পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে চলতি বছরের ২৯ আগস্ট যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘটনার সময় গুলিতে আহত হওয়া বর্তমান সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। অতীতেও সরোয়ারকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। গত বছরের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হলে দুজন নিহত হলেও সরোয়ার অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যরা এই দীর্ঘসূত্রতায় বিচার পাওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিজের এলাকায় এমন হামলার আশঙ্কা করেননি সরোয়ার।




