Eng
খুলনা, লিড নিউজ

৩৬ ঘণ্টায় ৪ প্রাণহানি, খুলনা ও রূপসায় তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক

প্রকাশিত: , ৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১:০২ অপরাহ্ণ



খুলনা মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী রূপসা উপজেলায় মাত্র ৩৬ ঘণ্টার ব্যবধানে চারটি পৃথক নির্মম ঘটনায় চারজনের জীবনাবসান ঘটেছে। একের পর এক এসব ঘটনায় সমগ্র এলাকা জুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের তদারকি ও টহল জোরদার করেছে। ধারাবাহিক লাশের মিছিলে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে খুলনা।

সর্বশেষ গতকাল সোমবার রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের সিংহেরচর এলাকার নদীর চর থেকে দুই ব্যক্তির নিথর দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

নিহতদের মধ্যে একজন রাজাপুর এলাকার আব্দুল্লাহর ছেলে মেহেদী হাসান সোহাগ (৩৫), যিনি পেশায় জেলখানা ঘাটের মাঝি ছিলেন। অপরজন একই উপজেলার বাসিন্দা রেজাউল করিম (৩০)। স্থানীয় বাসিন্দারা বেলা ১১টার দিকে নদীর কাদামাটিতে প্রথম একটি অবয়ব দেখতে পান এবং পরবর্তীতে ভাটার সময় অপর অবয়বটি উন্মোচিত হলে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। রূপসা থানার ওসি মাসুম খান জানান, জোয়ারের পানিতে দেহ দুটি ভেসে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিহত সোহাগ স্থানীয় সন্ত্রাসী দল ‘বি’ কোম্পানির সদস্য ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। রূপসা থানা পুলিশ ও জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানান, দুটি দেহের মাথায় গুলির ক্ষত রয়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে অন্য কোথাও ঘটনা ঘটিয়ে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পরে ভাটার সময় পানি কমে গেলে একই এলাকায় আরেকটি লাশ দেখা যায়।

এর আগে গত রোববার সন্ধ্যায় আড়ংঘাটা থানার রায়েরমহল এলাকার ‘আল-ক্যান্টিনো’ রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে চার-পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তি হামলা চালালে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান নগর তাঁতীদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে সৈয়দ নুর আমিন সৌহার্দ্য বাদী হয়ে ছাত্রদল নেতা আরাফাতসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরো কয়েকজনকে আসামি করে আড়ংঘাটা থানায় মামলা করেছেন। ওসি হালিমুর রহমান জানান, ইতোমধ্যে এজাহারভুক্ত শেখ সিদ্দিক (৫৩) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে।

অন্যদিকে গত শনিবার রাতে লবণচরা থানার কাশেমিয়া জামে মসজিদের অদূরে সড়ক থেকে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় শহীদুল ইসলাম কলিন (৩৫) নামে এক যুবকের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাকে আঘাত করা হয়েছিল বলে পুলিশের ধারণা। নিহত কলিনের বিরুদ্ধে মাদক ও সহিংসতা সংক্রান্ত মোট আটটি মামলা ছিল। তার বাবা মাহতাব বাদী হয়ে চারজনের নাম উল্লেখসহ মামলা দায়ের করেছেন। লবণচরা থানার ওসি সৈয়দ মোশারেফ হোসেন জানিয়েছেন, তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তদের নাম গোপন রাখা হয়েছে। পুলিশের দাবি, দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে হত্যার পর লাশ ফেলে যায়। অন্যদিকে গত শনিবার রাতে লবণচরা থানাধীন কাশেমিয়া জামে মসজিদ থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে শহীদুল ইসলাম কলিন (৩৫) নামে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

কেএমপির ডিবির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া জানান, নগরীর ভেতরের দুটি ঘটনার প্রাথমিক অনুসন্ধানে কিস্তির পাওনা টাকা ও মাদক সংক্রান্ত বিরোধের সূত্র পাওয়া গেছে। জেলা ও নগর মিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে মোট ৭৫টি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। খুলনা মহানগরীর আটটি থানায় ২০২৪ সালে ২৯টি, ২০২৫ সালে ৩৭টি এবং চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৩০টি ঘটনা ঘটে, যা গত ৩৩ মাসে মোট ৯৬টিতে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এসব অপরাধের মূলে মূলত অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের কারবার, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ শত্রুতা কাজ করছে। তবে তার বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। সে হিসাবে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৩ মাসে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৯৬টি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশের পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, পূর্বশত্রুতা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিরোধের মতো কারণ রয়েছে।

পূর্ববর্তী ঘটনার ধারাবাহিকতায় গত ২২ অক্টোবর নগরে পৃথক দুটি ঘটনায় তাওহিদুল ইসলাম নামে এক যুবক ও খুশি আক্তার নামে এক নারী প্রাণ হারান। পুলিশ জানায়, তাওহিদুল ‘পলাশ গ্রুপের’ সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যাদের সঙ্গে ‘গ্রেনডে বাবু’ ওরফে রনি চৌধুরী গ্রুপের বা বি কোম্পানির কোন্দল রয়েছে। নিহত খুশি আক্তার মাদক কারবারে যুক্ত ছিলেন বলে তথ্য মিলেছে। এছাড়া ২৪ ও ২৫ অক্টোবর বটিয়াঘাটায় বিএনপি ও যুবদলের দুই নেতা গুলিবিদ্ধ হন এবং নিরালা মোড়ে সালমান হাওলাদার নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবী সন্ত্রাসী হামলায় জখম হন। এরপর ২৪ ও ২৫ অক্টোবর বটিয়াঘাটার বিএনপি ও যুবদলের দুই নেতাকে গুলি করা হয়।

শিল্প নগরীতে উদ্ভূত এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী বুধবার খুলনা সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২০২৭ (সিজন-২)’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে খুলনা জুড়ে বাড়তি নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে এবং পুলিশের টহল তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তৎপরতা বাড়িয়েছে পুলিশ।