Eng
লিড নিউজ, সম্পাদকীয়

কাপ্তাই হ্রদের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক: জনস্বাস্থ্যে বড় ঝুঁকি

প্রকাশিত: , ৬ নভেম্বর ২০২৬ | ৯:১৬ অপরাহ্ণ

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদের ছোট মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করেছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ডিসকভার এনভায়রনমেন্ট’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এই ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার অংশ হিসেবে সংগ্রহ করা ৭৫টি নমুনা মাছের প্রতিটিতেই পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। এই পরিবেশগত ট্র্যাজেডির মূলে রয়েছে পর্যটন বিকাশ ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে সমন্বয়হীনতা। রাঙামাটি ও কাপ্তাই হ্রদের প্রকৃতিকে পুঁজি করে ব্যবসা ও বিনোদনের আয়োজন হলেও প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখার ন্যূনতম দায়িত্ব কেউ পালন করছে না। কাপ্তাই হ্রদের ছোট মাছের এই দূষণ কেবল পরিবেশের ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। অর্থাৎ অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও পরিবেশ ধ্বংসের খেসারত শেষ পর্যন্ত মানুষকেই তার জীবনের ঝুঁকি দিয়ে দিতে হচ্ছে।

তদন্তে দেখা গেছে, হ্রদের তলদেশের কাদা ও বালু থেকে খাদ্য গ্রহণকারী ট্যাংরা মাছে প্লাস্টিকের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এই মাছে প্রতি গ্রামে গড়ে ০.৬৩টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। মাছের দেহে পাওয়া এসব প্লাস্টিক কণার ৮৫ শতাংশই ফাইবার বা সুতা আকৃতির এবং ৭১ শতাংশই পলিথিনজাতীয়। সাধারণত ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল, মোড়ক, গৃহস্থালি বর্জ্য এবং পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল ভেঙে এই ক্ষুদ্র কণাগুলো তৈরি হয়েছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।

এই পরিস্থিতির পেছনে হ্রদকে ঘিরে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন শিল্প ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হচ্ছে। পর্যটকদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেন ও বৃষ্টির পানির মাধ্যমে সরাসরি হ্রদে মিশছে। যেহেতু ছোট মাছগুলো সাধারণত নাড়িভুঁড়িসহ আস্ত রান্না করে খাওয়া হয়, ফলে এই মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। নিয়মিত এই দূষিত মাছ খাওয়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদে জটিল শারীরিক সমস্যা সৃষ্টির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অব্যবস্থাপনার চিত্রও হাজির করেছে। এই তথ্যগুলোই মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক মেলার কারণ স্পষ্ট করে তোলে। গবেষকদের মতে, নিয়মিত এসব প্লাস্টিকযুক্ত মাছ খেলে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের শরীরে জটিলতা তৈরি হবে।

এই পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে দ্রুত প্রশাসনিক ও নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে প্লাস্টিক ব্যবহার অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম বাধ্যতামূলক করা জরুরি। হ্রদ সংলগ্ন বাজার ও বসতিগুলোতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও কঠোর নজরদারি জোরদার করতে হবে। এখনই এই মারাত্মক সংকট সামাল দিতে প্রশাসনিক ও নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। পর্যটক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য দায়িত্বশীল বর্জ্য ফেলার নিয়ম বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।