
ক্রাইম এডিশন, ডেস্ক রিপোর্ট:
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য থেকে জানা গেছে। আক্রান্ত গবাদিপশু জবাই, মাংস কাটা, পরিষ্কার করা কিংবা রান্নার প্রস্তুতির সময় সংস্পর্শে এসে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সংক্রমণের ধরন নির্ণয়ে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) একটি দল গাংনীতে কাজ শুরু করেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে মেহেরপুরে প্রথম অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়। গাংনী উপজেলার কাজিপুর গ্রামে প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এর বিস্তার ঘটে। গত প্রায় দুই দশকে গাংনীর বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ৭ হাজার মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন বলে স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ রোগে মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।
গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৯৯ জন। ২০১৪ সালে ২০৩, ২০১৫ সালে ১৫৪, ২০১৬ সালে ২৪০, ২০১৭ সালে ২৮১, ২০১৮ সালে ৪০৮, ২০১৯ সালে ৬৬০, ২০২০ সালে ৩৭৮, ২০২১ সালে ৪১৭, ২০২২ সালে ৬৪৪, ২০২৩ সালে ৭৯৩, ২০২৪ সালে ৬৮৬ এবং ২০২৫ সালে ৬৩৭ জন আক্রান্ত হন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৪৬২ জন বলে জানা গেছে। আক্রান্তদের সবাই গাংনী উপজেলার বাসিন্দা বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
চলতি বছরের গত চার মাসে অ্যানথ্রাক্স সন্দেহে ৫৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। এর মধ্যে ৪৫ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি দুই শতাধিক গবাদিপশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা রয়েছে।
আক্রান্তদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পশুর মাংস সরাসরি নাড়াচাড়া করার পর হাত বা শরীরের বিভিন্ন স্থানে জ্বালাপোড়া, ফোস্কা ও পরে ক্ষত তৈরি হয়েছে। বাউট গ্রামের রবিউল ইসলাম একটি ছাগল জবাইয়ের পর মাংস নাড়াচাড়া করেছিলেন। এরপর তার কবজিতে জ্বালাপোড়া ও ফোস্কা দেখা দেয়। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করালে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয় বলে তিনি জানান।
দেবীপুর গ্রামের সাথি খাতুনও ফ্রিজ থেকে মাংস বের করে রান্নার প্রস্তুতি নেওয়ার পর দুই হাতে জ্বালাপোড়া ও ফোস্কার মতো উপসর্গ অনুভব করেন। একইভাবে আসমা আক্তার ও বাউট গ্রামের পলি খাতুনের শরীরেও মাংসের সংস্পর্শের পর ক্ষত দেখা দেওয়ার কথা জানা গেছে। ভোমরদহ গ্রামের নাজমুল হোসেন বাজার থেকে কেনা গরুর মাংস নাড়াচাড়া করার পর শরীরে ক্ষত তৈরি হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গাংনীর সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলক বেশি। বাউট, কাজিপুর, মটমুড়া, সাহারবাটি, বামন্দী, দেবীপুর, তেরাইল, দুর্লভপুর, সাহেবপুর, ছাতিয়ান ও রায়পুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও রোগটির সংক্রমণের তথ্য রয়েছে।
অ্যানথ্রাক্স মূলত ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে হয়ে থাকে। আক্রান্ত গরু, ছাগল, মহিষ বা ভেড়ার রক্ত, চামড়া, মাংস কিংবা অন্যান্য টিস্যুর সংস্পর্শে মানুষের শরীরে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। মাটিতেও এ জীবাণুর স্পোর দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে কম দামে গবাদিপশু আনার ঘটনা রয়েছে। এসব পশুর মধ্যে অসুস্থ বা আক্রান্ত পশু থাকলে সেগুলো জবাই করে মাংস বিক্রির মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। তবে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে পৃথকভাবে নিশ্চিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আইইডিসিআরের একটি দল বর্তমানে গাংনীতে কাজ করছে। সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। আক্রান্তদের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের ধরন শনাক্তের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন ডা. আরিফ। তাঁর সঙ্গে টেকনিশিয়ান আব্দুল গাফফারসহ আরও দুই সদস্য রয়েছেন।
গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা একরামুল হক জানিয়েছেন, মেহেরপুরে প্রাথমিকভাবে স্কিন অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং সন্দেহভাজনদের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে।
গাংনী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আরিফুল ইসলাম জানান, এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই অ্যানথ্রাক্সপ্রবণ। বিশেষ ব্যবস্থায় গবাদিপশুর টিকাদান কার্যক্রম চলছে। এরই মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার পশুকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।
মেহেরপুরের সিভিল সার্জন আবু সাঈদ বলেন, অ্যানথ্রাক্সের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করছে। বিশেষ করে মাংস কাটার সময় গ্লাভস ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন পশু জবাই ও মাংস বিক্রি থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। মাংস কাটার সময় সুরক্ষা নেওয়া এবং শরীরে অস্বাভাবিক ফোস্কা বা ক্ষত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি গবাদিপশুর নিয়মিত টিকাদান ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।



