Eng
অপরাধ, আন্তর্জাতিক, জাতীয়, ঢাকা, রাজনীতি, লিড নিউজ, সারা দেশ

জুলাই আন্দোলন দমনে গুলির অভিযোগ, ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য

প্রকাশিত: , ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৮:০৫ অপরাহ্ণ




নিজস্ব প্রতিবেদক:

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে করা মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন জুলাইযোদ্ধা মো. হান্নান মিয়া। তার জবানবন্দিতে আন্দোলন দমনে গুলি চালানো, কারফিউ জারি এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উঠে এসেছে। তবে এসব বক্তব্য সাক্ষীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মামলায় দেওয়া জবানবন্দির অংশ; অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১-এর দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে হান্নানের সাক্ষ্য রেকর্ড করা হয়। বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন প্যানেলে ছিলেন বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। মামলায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলামকে আসামি করা হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং সাক্ষ্যগ্রহণের সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
জবানবন্দিতে হান্নান দাবি করেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলির ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর সন্ধ্যায় তিনি টেলিভিশনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৪ দলের নেতাদের বৈঠকের খবর দেখেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকের পর কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত জানানো হয় এবং আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নামলে গুলি চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তিনি আরও দাবি করেন, বৈঠকে রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন এবং তারা ওই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন।
হান্নানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই তিনি ঢাকার জিগাতলা থেকে বাড্ডার দিকে যাওয়ার পথে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীদের সংঘর্ষ দেখতে পান। সেখানে কয়েকজনকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখার পর তিনি আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পরদিন ১৮ জুলাই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কথাও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, ওই এলাকায় পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন গলিতে আশ্রয় নেন। পরে আহত কয়েকজনকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর কথাও জানান তিনি।
১৯ জুলাইয়ের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে হান্নান বলেন, দুপুরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে একটি মিছিল নিয়ে প্রগতি সরণির দিকে যাওয়ার সময় দক্ষিণ দিক থেকে পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলির মুখে পড়েন তারা। এতে কয়েকজন আহত হন বলে তার দাবি। আহত দুজনকে হাসপাতালে নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০ জুলাইও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলির ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হন এবং কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বাড্ডা ইউলুপের কাছাকাছি একজনের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখার কথাও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। পরে আরও দুজনকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও সন্ধ্যার পর তাদের মৃত্যুর খবর শুনেছিলেন বলে জানান হান্নান।
জবানবন্দিতে নিজের আহত হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন এই জুলাইযোদ্ধা। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ‘লংমার্চে’ অংশ নেওয়ার জন্য ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অবস্থান করার সময় রামপুরা সেতুর দিক থেকে গুলি ছোড়া হয়। এ সময় তার পায়ে গুলি লাগে বলে দাবি করেন তিনি। একইসঙ্গে মারধরের ঘটনায় মাথা ও কপালে আঘাত এবং বাঁ কাঁধের হাড় ভেঙে যাওয়ার কথাও জানান। পরে আন্দোলনকারীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
হান্নান মিয়া বর্তমানে সাংবাদিকতা করেন। তার আগে তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বাড্ডা এলাকায় তার এসির শোরুম ছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সরকারি গেজেটে ‘খ’ শ্রেণির জুলাইযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বলে জানানো হয়েছে।
মামলায় প্রসিকিউশনের অভিযোগ, আন্দোলন দমনে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহারে প্ররোচনা এবং কারফিউ জারির পেছনে আসামিদের ভূমিকা ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে সাক্ষ্য, প্রমাণ ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অভিযোগগুলোর বিচার হবে।